মতপ্রকাশের জন্য শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া যায় না: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা প্রণয়ন করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। রবিবার (২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’।

বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বছর শেষে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে আমরা অত্যন্ত আশঙ্কার সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সরকার-সমর্থক শিক্ষকদের একটি অংশ ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার নামে ২৩১ জন শিক্ষকের একটি তালিকা প্রণয়ন করে তাদের সবার বিরুদ্ধে ঢালাও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি নিয়ে উপাচার্যের কাছে হাজির হয়েছেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা পরিপন্থি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক, কারণ রাজনৈতিক মত প্রকাশ বা সমর্থন কোনও অপরাধ নয়।

সংগঠনটির ভাষ্য, কেবল ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় সহকর্মীদের প্রতি এহেন প্রতিশোধমূলক আচরণ আমাদের কেবল ক্ষমতার দর্পে অন্ধ হওয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শিক্ষকদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। একই সময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম, গত ২৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং চার শিক্ষককে সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের তৎপরতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা শুরুতেই স্পষ্ট করতে চাই— জবাবদিহির প্রশ্নটিকে আমরা কোনোভাবেই খাটো করে দেখছি না। জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক যে দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যারা শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতায় প্ররোচনা বা নির্দেশনা দিয়েছেন, আবাসিক হলের নিপীড়নমূলক পরিবেশকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অভিযোগ করেছেন কিংবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছেন— তাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জুলাইয়েরই অন্যতম অঙ্গীকার। শিক্ষক হিসেবে নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যারা ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু এই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, প্রতিহিংসা কিংবা মতাদর্শিক শুদ্ধি-অভিযানের মধ্য দিয়ে নয়। ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের উদ্বেগ ও প্রতিবাদ।

সংগঠনটি বলে, আমাদের উদ্বেগ দুটি পৃথক বিষয়কে ঘিরে। প্রথমত, শিক্ষকদের একটি অংশ কর্তৃক ২৩১ জনের ঢালাও তালিকা প্রণয়ন করে তা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়ে সম্মিলিত শাস্তির দাবি জানানো এবং প্রশাসন কর্তৃক এই তালিকাভুক্ত সবার বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন— যদিও এ পর্যন্ত এর ভিত্তিতে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমন ঢালাও তালিকাভিত্তিক তদন্ত-প্রক্রিয়া নিজেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। দ্বিতীয়ত, সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা— যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযুক্তরা জানিয়েছেন। এই উভয় প্রক্রিয়াই অস্বচ্ছ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী শিক্ষকদের রাজনৈতিক মত পোষণ ও প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত; কেবল রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা সমর্থন কোনও অপরাধ নয়। ফলে ‘জুলাইবিরোধী মনোভাব’ নিজে থেকে কোনও আইনি অভিযোগ হতে পারে না। উক্ত আদেশের ৫৬(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনও শিক্ষককে কেবল নৈতিক স্খলন বা অদক্ষতা, চাকরি বিধিমালা ভঙ্গ বা অশিক্ষকসুলভ আচরণের অভিযোগে, এবং যথাযথ তদন্ত ও প্রতিনিধির মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদানের পরই শাস্তির আওতায় আনা যায়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ভর্ৎসনা থেকে শুরু করে ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতি স্থগিত, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতি পর্যন্ত ধাপে ধাপে শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান আদেশে বিদ্যমান। এই স্তরবিন্যস্ত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ঢালাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ আইনের শাসনের পরিপন্থি এবং এতে প্রকৃত অপরাধীদের অপরাধও লঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সংগঠনটি আরও জানায়, কোনও ব্যক্তিকে কেবল একটি মত পোষণ, প্রকাশ কিংবা সমর্থনের জন্য— সেই মত যতই আপত্তিকর হোক না কেন— শাস্তি দেওয়া যায় না, যতক্ষণ না তিনি সেই মতকে সহিংস বা ক্ষতিকর বাস্তবতায় রূপ দিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেন। কোনও অগ্রহণযোগ্য অবস্থান কারও প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা হয়তো হ্রাস করতে পারে, কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া তা কারও জীবিকা কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।

তারা বলেন, আমাদের এই অবস্থান ব্যক্তি বা পক্ষ-নির্বিশেষে অভিন্ন। অতীতে যখন কেবল একটি উপসম্পাদকীয় লেখার কারণে যথাযথ ট্রাইব্যুনাল-প্রক্রিয়া ছাড়াই একজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। ন্যায়বিচার ও যথাযথ প্রক্রিয়ার দাবি কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ হচ্ছে, তার ভিত্তিতে বদলে যায় না।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিহিংসা বা মতাদর্শগত শুদ্ধি-অভিযানের ক্ষেত্র নয়; এটি মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও উন্মুক্ত বিতর্কের একটি সর্বজনীন পরিসর— চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠান। এই মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি নিম্নলিখিত আহ্বান জানাই-

যেকোনও ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ নিশ্চিত করা; প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত পরিচালনা করা; অভিযুক্ত প্রত্যেককে অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করা; প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ১৯৭৩ সালের আদেশে নির্ধারিত স্তরবিন্যস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা; এবং কেবল রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা তালিকার ভিত্তিতে গৃহীত সকল ঢালাও ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহার করা।

/এএজে/এফআর/
সম্পর্কিত
ঢাবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের হাতাহাতি
অবশেষে যোগ দিচ্ছেন প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষক
ডিগ্রি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হোক বিশ্ববিদ্যালয়: ইউজিসি চেয়ারম্যান
সর্বশেষ খবর
২৮ লাখ টাকার জাল নোটসহ গুলশানে ২ জন গ্রেফতার 
২৮ লাখ টাকার জাল নোটসহ গুলশানে ২ জন গ্রেফতার 
আদালতে আসামিকে পাউরুটি দিলেন স্বজনরা, ভেতরে মিললো ইয়াবা-গাঁজা
আদালতে আসামিকে পাউরুটি দিলেন স্বজনরা, ভেতরে মিললো ইয়াবা-গাঁজা
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় আপিল শুনানি ১১ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় আপিল শুনানি ১১ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি
ঢাবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের হাতাহাতি
ঢাবিতে ছাত্রদল ও শিবিরের হাতাহাতি
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধুদের নিয়ে চায়ের দোকানে এইচএসসির খাতা মূল্যায়ন: বস্তাভর্তি উত্তরপত্রসহ ধরা পড়লেন শিক্ষক
বন্ধুদের নিয়ে চায়ের দোকানে এইচএসসির খাতা মূল্যায়ন: বস্তাভর্তি উত্তরপত্রসহ ধরা পড়লেন শিক্ষক
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
কখন বুঝবেন ‘চাকরিটা এবার ছাড়ার সময় হয়েছে’
অভাবের সংসার থেকে বাংলাদেশ টেস্ট দলে, মুশফিকের সংগ্রামের গল্প
অভাবের সংসার থেকে বাংলাদেশ টেস্ট দলে, মুশফিকের সংগ্রামের গল্প
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব
আসিয়ানে যোগ দেওয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি
যে ফলের দাম আইফোনের চেয়েও বেশি