বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের সন্তান সংগীত প্রযোজক সানজয়। নোরা ফাতেহি ও ভেজড্রিমকে সাথে নিয়ে অল্প সময়ের সেই পারফরম্যান্স ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি নিজের শেকড়কেও ভুলে যান নি। বরং বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে কৌশলে নিজের লাল সবুজের দেশকেই দেখিয়ে দিয়েছেন হাতের ইশারায়। গানপাগল এ সৃষ্টিশীল তরুণ দীর্ঘদিন ধরেই হলিউড বলিউডে নামি দামি শিল্পীদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চই কেবল তাকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে গৌরবের প্রতীকরূপে সামনে নিয়ে এলো। কানাডার টরেন্টো থেকে বাংলা ট্রিবিউনের সাথে আলাপকালে তিনি তুলে ধরেন সেই অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।
আপনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল স্টেজে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই মুহূর্তটা আপনার কাছে কেমন লাগছে?
এটা আসলে শব্দে প্রকাশ করা খুব কঠিন। সবকিছু এত দ্রুত হয়ে গেল। আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি ও রিহার্সাল করেছি, আর হঠাৎই আপনি ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন, কয়েক মিনিট পরই সেটা শেষ হয়ে যায়।
আমার মাথায় তখনই বাবা-মায়ের কথা আসছিল, তাদের সব ত্যাগের কথা মনে পড়ে। আমি ভাবছিলাম, আমি যখন ছোট ছিলাম, স্যান হোসেতে বড় হয়েছি, বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে এসে সেখানে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, আমি নিজের ঘরে বসে গান বানাতাম এবং এমন মুহূর্তের স্বপ্ন দেখতাম। আমি কখনও ভাবিনি যে একদিন ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করব।
এটা ছিল আবেগের, অবাস্তব এক অনুভূতি। সবচেয়ে বেশি আমি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছি। আমি আমার ছোটবেলার নিজের কথাও ভাবছিলাম। যদি কেউ তখন বলত যে একদিন তুমি ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে পারফর্ম করবে, সে হয়তো বিশ্বাসই করত না। কিন্তু আজ আমরা এখানে।
আপনার পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের রঙ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অনেক প্রতীকী উপাদান ছিল। এই কনসেপ্ট কার ভাবনা ছিল এবং পোশাকটি কে ডিজাইন করেছেন?
পোশাকটি ডিজাইন করেছেন আমার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ছায়া কুমার। এমব্রয়ডারি করেছেন জন মিম এবং স্টাইলিং করেছেন জ্যাসমিন প্যাটেল—এটা আমার পুরো পারফরম্যান্সের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশগুলোর একটি ছিল।
আমরা চেয়েছিলাম এটা আমার শেকড়ের গল্প বলুক। ডিজাইনে ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যা শক্তি, সাহস ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। এছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা এবং বাংলাদেশের পতাকার লাল-সবুজ রঙের অনুপ্রেরণাও যুক্ত করা হয়েছিল। আমার জন্য এটা শুধু পতাকা নেড়ে কোনো বার্তা দেওয়ার বিষয় ছিল না। এটা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের ঘরের একটা অংশ বহন করে নিয়ে যাওয়া।
আমি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই জায়গাতেই বড় হয়েছি। তাই আমার পরিচয় সবসময় এই দুই জায়গা মিলিয়েই গড়ে উঠেছে। এটা ছিল সেই শেকড়কে সম্মান জানানোর একটি উপায়, একইসঙ্গে বিশ্ব দর্শকের সঙ্গে সেই মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া।
মানুষ যখন এই ডিটেইলগুলো চিনতে পেরেছে এবং সংযোগ অনুভব করেছে, সেটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। চায়া প্রতিটি ডিজাইনে অনেক ভাবনা, ভালোবাসা ও যত্ন দিয়েছেন। এমন একটি মঞ্চে তার কাজ বিশ্ব দেখেছে—এটা নিয়ে আমি খুব গর্বিত।
পারফরম্যান্সের সময় আপনি কী অনুভব করছিলেন?
আসলে সবকিছু এত দ্রুত হচ্ছিল যে আমি শুধু মুহূর্তটা অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। আমি গর্ব অনুভব করেছি, কৃতজ্ঞতা অনুভব করেছি, আর মনে হচ্ছিল যেন একটা শিশুর স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেছে। এমন মঞ্চে দাঁড়ালে আপনি বুঝতে পারেন, এখানে আসতে কত মানুষ সাহায্য করেছে—পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, ভক্ত, মেন্টর—কেউ একা এমন জায়গায় পৌঁছায় না।
আমি শুধু চেষ্টা করছিলাম প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে, কারণ জানতাম এটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
আপনার গান ‘সির সির’ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন শ্রোতায় পৌঁছেছে। শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া কেমন পাচ্ছেন?
সত্যি বলতে এটা অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে ভালো লাগছে যে বিভিন্ন দেশ ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ গানটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আমি মানুষদের ভিডিও দেখেছি যেখানে তারা গানটি গাইছে, নাচছে, অনলাইনে শেয়ার করছে। এটাই আমার লক্ষ্য ছিল—এমন গান তৈরি করা যা মানুষকে একসঙ্গে যুক্ত করে। ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত একটি গান বিশ্বজুড়ে নিজের মতো করে ছড়িয়ে পড়ছে—এটা দেখা দারুণ অভিজ্ঞতা।
আমরা যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটা আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছে।
এই গান তৈরিতে বাংলাদেশের কো-প্রডিউসার ও কো-লিরিসিস্ট রাসেল আলীর অবদান সম্পর্কে বলুন
রাসেল গানটিকে জীবন্ত করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আমার দীর্ঘদিনের মেন্টর এবং বন্ধু। আমরা বহু বছর ধরে একে অপরকে চিনি, বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে কাজ করেছি। আর এখন আমরা এমন একটি গানে একসঙ্গে কাজ করেছি, যা ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সাউন্ডট্র্যাকে জায়গা পেয়েছে। তিনি একজন অসাধারণ প্রযোজক ও গীতিকার। বাংলাদেশের একজন মানুষ এই গানের অংশ—এটা পুরো বিষয়টাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।
এই গানটি সত্যিকার অর্থে বিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে মরক্কো-কানাডার নোরা ফাতেহি, ফ্রান্সের ভেজেড্রিম, সেন্ট থমাসের থেরন থমাস এবং বাংলাদেশের শেকড় থেকে আমরা—সবাই মিলে কাজ করেছি। এটা রাতারাতি তৈরি হয়নি। অনেক সেশন, অনেক আইডিয়া, অনেক পরিবর্তনের পর শেষ ভার্সন এসেছে।
আজ যখন দেখি এটা ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সাউন্ডট্র্যাকে জায়গা পেয়েছে, সেটা সত্যিই অবিশ্বাস্য অনুভূতি।
বাংলাদেশের মানুষ আপনার দেশপ্রেমে গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছে। আপনি তাদের কী বলতে চান?
আমি শুধু ধন্যবাদ বলতে চাই। গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটা সত্যিই অভিভূত করার মতো। জীবন আমাকে যেখানেই নিয়ে যাক, বাংলাদেশ সবসময় আমার পরিচয়ের অংশ থাকবে। সবার জন্য আমার বার্তা—স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করো না। আমি আশা করি এই মুহূর্ত মানুষকে দেখাবে, বড় স্বপ্ন দেখা সম্ভব এবং সেটা বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের সমর্থন আমার জন্য সবকিছু, এবং আমি এটা সবসময় সঙ্গে রাখব।
আপনি কি বাংলাদেশে নতুন কিছু নিয়ে কাজ করছেন?
অবশ্যই। বাংলাদেশ সবসময় আমার পরিচয় ও সংগীতের বড় অংশ হয়ে থাকবে। আমি বাংলাদেশি সংগীত থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমার অনেক নতুন বাংলা গান আসছে, যা নিয়ে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। পাশাপাশি আমি গ্লোবাল কল্যাবরেশন ও বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করছি, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশবে।





