ঈদের ৩ ছবি এবং কিছু আক্ষেপ

Send
মোস্তাফিজুর রহমান মানিক
প্রকাশিত : ১৪:৪৩, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৭, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৬

রক্ত। শুটার। বসগিরি।এটাকে আমি ঠিক চিত্র সমালোচনা বলবো না। বরং ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত তিনটি চলচ্চিত্র দেখে দর্শক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি যেমন হয়েছে সেটাই পাঠক-দর্শকদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।


শুটার: লাভবান প্রযোজক, ক্ষতিগ্রস্ত প্রদর্শক

দেখেছি: ১৩ সেপ্টেম্বর

প্রেক্ষাগৃহ: রাজমনি

রেটিং: ৪.৫/১০
প্রযোজক: মোহাম্মদ ইকবাল

শুটার।‘শুটার’ চলচ্চিত্রটির পরিচালক রাজু চৌধুরীকে বাণিজ্যিক ছবির একজন সফল নির্মাতা হিসেবে আমরা জানি। ঈদে তার ট্র্যাক রেকর্ডও ভালো। তার পরিচালনায় ‘সাহেব নামের গোলাম’ ও ‘প্রিয়া আমার জান’ নামের দুটি ছবিই ভালো ব্যবসা করেছিল।

মূলত রাজু চৌধুরী পরিচালক আর ছবির নামটি ‘শুটার’ হওয়ার কারণে শাকিব খান, নবাগত বুবলী, সম্রাট, শাহরিয়াজ ও মিসা সওদাগর অভিনীত এ ছবিটি মুক্তির আগেই বুকিং এজেন্ট ও প্রদর্শকদের মধ্যে আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল, বোঝা যায়। এর ফলে ছবিটির প্রযোজক সর্বাধিক হলে ছবিটি মুক্তি দিয়ে তার লগ্নিকৃত টাকা উঠিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন, হয়তো। কিন্তু যে ছবিটিকে ঘিরে এত প্রত্যাশা, সেটা কি আদৌ পূরণ হয়েছে? আগ্রহ নিয়ে ছবিটি দেখা শেষে আমার মনে সেই প্রশ্নটাই বার বার জেগেছ।

জবাবে, একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি বলবো- একেবারেই না। গতানুগতিক ধারার গল্প, তার চেয়ে গতানুগতিক নির্মাণ- ছবিটিকে মানহীন করে ফেলেছে। ‘শুটার’ নামটির স্বার্থকতা বোঝানোর জন্য ছবিতে এত বেশি গোলাগুলি করা হয়েছে যে, কখনও কখনও মনে হয়েছে- ‘আপনি প্রেক্ষাগৃহে নয় বরং অন্য কোথাও বসে আছেন’।

দেখুন ‘শুটার’ ছবির ‘কী করে আজ বলবো’

বাজেট স্বল্পতা ও তড়িঘড়ি করে শেষ করার কারণে ছবির সর্বত্র অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। এটুকু বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। প্রোপ্রার টিউন এবং কম্পোজিশন না হওয়ায়, লিরিক ভালো হওয়া সত্ত্বেও গানগুলো হারিয়েছে শ্রুতিমধুরতা। খুব কষ্ট নিয়েই বলছি- কোরিওগ্রাফি, অ্যাকশন, সম্পাদনা, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কালার কারেকশন কোনওটাই ছবিটির পক্ষে কাজ করেনি। বরং আইটেম সং, আর শাহরিয়াজের গানটি বাংলা ছবিতে রুচিহীনতার নতুন সংযোজন বলেই মনে হয়েছে আমার।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে শাকিব খান সব সময়ের মতো ভালো। মিশা শওদাগর তার মতোই দুর্দান্ত। নবাগত বুবলী আসলে এখানে নিজেকে প্রকাশের কোনও সুযোগই পাননি। তার চরিত্রটি এতটাই অপ্রয়োজনীয় করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা অনেকাংশেই অযৌক্তিক মনে হয়েছে। অভিনয়ে সম্রাট, শাহরিয়াজ যার যার ক্ষেত্রে ভালো করার চেষ্টা করেছেন।

সর্বপরি বলবো, ‘শুটার’ চলচ্চিত্রটিতে লাভবান হয়েছেন প্রযোজক, ক্ষতিগ্রস্ত প্রদর্শক। আর দর্শক, তাদের পছন্দের ব্যাপারটা যে আমার পছন্দ বা লেখার উপর নির্ভর করে না সেটা ছবিটির শো শেষ করে বের হয়ে আসা কয়েকজন দর্শককে জিজ্ঞেস করেই বুঝে গেছি।

আমি যখন তাদের জিজ্ঞেস করলাম ছবিটা কেমন লেগেছে? তারা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘সেই রকম ছবি। ধুন্দুমার অ্যাকশন!’

বোঝেন তাহলে, আমাদের দর্শকদের হাল।

 

রক্ত: চোখকে আরাম দেয়, কিন্তু হৃদয় ছুঁয়ে যায় না

দেখেছি: ১৪ সেপ্টেম্বর

প্রেক্ষাগৃহ: জোনাকি

রেটিং: ৬.৫/১০

ব্যানার: জাজ মাল্টিমিডিয়া

রক্ত।পরীক্ষিত এবং স্বনামধন্য পরিচালক ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত ‘রক্ত’ ছবিটি এই ঈদের একমাত্র বৈচিত্র্য বা ব্যতিক্রম বলা যায়। কারণ এটিই একমাত্র ছবি, যার সফলতা-বিফলতার সমস্ত ‘বোঝা/দায়’ শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের ওপরে না। বরং একজন নারী অর্থাৎ সানিয়া বা নূরীরূপী পরীমনির কাঁধেই।

খুব সম্ভবত ‘রক্ত’-ই ওয়াজেদ আলী সুমন ও পরীমনির সবচেয়ে বড় ক্যানভাসের ছবি। এবং সন্দেহাতীতভাবে বোঝাই যায় তারা দুজনই তাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি ছবিটিকে একটি গ্রহণযোগ্য রূপ দেওয়া জন্য। সুন্দর লোকেশন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, শ্রুতিমধুর গান তার সঙ্গে মানানসই কোরিওগ্রাফি, অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এবং সর্বোপরি দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছবিটিকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তবে বিচ্ছিন্ন কিছু অসঙ্গতি থেকেই গেছে। যেমন- হাসপাতালে নূরীরজান ফেরার পর কিছু না জানা সত্ত্বেও নূরীকে ডাক্তারের সব ঘটনা খুলে বলা, এনএসআই-এর এজেন্ট হওয়া সত্ত্বেও সানিয়ার বড় বোনের কোনওরকম প্রতিরোধ ছাড়াই অমিত হাসানের হাতে মরে যাওয়া। পানির নিচে সানিয়ার ট্রেনারের অযৌক্তিক উপস্থিতি, তাছাড়া কিছু কন্টিনিটি ব্রেকও চোখে পড়েছে। পুরো ছবিটি যাকে ঘিরে সেই পরীমনির চেষ্টা ও কঠিন পরিশ্রমকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। তিনি কোথাও কোথাও খুব ভালো করেছেন আবার কোথাও কোথাও বিশেষ করে মারামারির দৃশ্যগুলোতে চোখেমুখে সেইরকম কাঠিন্য আনতে ব্যর্থ হয়েছেন।

দেখুন ‘রক্ত’র ‘ডানাকাটা পরী’

একটি কথা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে পরীমনিকে কিছুটা ওভার এক্সপোজ করা হয়েছে। সেটা না করলে নারী দর্শক আরও বেশি পাওয়া যেত বলে আমার ধারণা, যা এ ছবির জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিল।

এ ছবির আরেক চমক হচ্ছে নতুন নায়ক রোশান। আশাতীতভাবে ভালো করেছেন রোশান। পুরো ছবিতে অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন তিনি। কখনওই নতুন মনে হয়নি। তার ভরাট কণ্ঠ তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। স্বাগতম রোশানকে। এছাড়া অমিত হাসান, আশীষ বিদ্যার্থী ও অন্যান্যরা যার যার জায়গায় ভালো করার চেষ্টা করেছেন।

তবে ছবিটি শেষ হওয়ার পর হল থেকে বের হওয়ার পথে মনে হয়েছে- সবকিছু আছে ‘রক্ত’-এ, কিন্তু কী যেন নেই! যেটি নেই সেটি হচ্ছে প্রাণ। তাই ‘রক্ত’ চোখকে আরাম দেয়, কিন্তু হৃদয়কে ছুঁয়ে যায় না।

 

বসগিরি: গল্প খুঁজতে যাওয়া বোকামি হবে

দেখেছি: ১৬ সেপ্টেম্বর

প্রেক্ষাগৃহ: পূর্ণিমা

রেটিং: ৫.৫/১০

ব্যানার: খান ফিল্মস

বসগিরি।‘বসগিরি’র পরিচালক শামিম আহমেদ রনি সৌভাগ্যবানদের একজন। গত ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রানা পাগলা- দ্য মেন্টাল’-এর পর এই ঈদেও তার একটি ছবি মুক্তি পেল। এটা সাম্প্রতিক কালে খুব কম পরিচালকদের বেলাতেই ঘটেছে। অবশ্যই ব্যাপারটি অভিনন্দন যোগ্য। বলতেই হয়, ‘রানা পাগলা’ যতটা হতাশ করেছিল, ঠিক ততোটা হতাশ করেনি ‘বসগিরি’।

বসরূপী শাকিব খানের ‘লার্জার দেন লাইফ’ ইমেজ তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে। এবং তা শাকিব খানের সঙ্গে যথেষ্ট মানানসই তো বটেই। দর্শক হিসেবে ছবিটিতে আলাদা করে কোনও গল্প খুঁজতে যাওয়া বোকামি হবে। কেননা সেই অর্থে কোনও গল্পই নেই এখানে।

বসের ‘বসগিরি’ই আসলে ছবির মূল উপজীব্য। এই ‘বসগিরি’ দেখাতে গিয়ে কখনও ‘মুন্নাভাই এম.বি.বি.এস’, কখনও ‘জয় হো’, কখনও অন্য ছবি থেকে ধার করা হয়েছে, যা একেবারেই প্রত্যাশিত না।

বসরূপী শাকিব খান বুবলীর মন জয় করার জন্য অনেকটাই সময় নিয়ে নিয়েছেন ছবিতে। ফলে গতি হারিয়ে অনেকটাই একঘেঁয়ে হয়ে দাঁড়ায় ছবিটি। আরও কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ। ইন্টার্ন ডাক্তারকর্তৃক এফ.আর.সি.এস করা ডাক্তারকে অর্ডার করা, রজতাভ দত্তের ডাবিং না করা, গানগুলো যথাস্থানে সংযোজন না করা, অপরিপক্ক ক্রোমার কাজ, কন্টিউনিটি ব্রেকসহ এমন অনেক কিছুই যথেষ্ট পীড়া দিয়েছে আমাকে।

দেখুন ‘বসগিরি’ ছবির ‘দিল দিল দিল’

তবে শ্রুতি মধুর গান, সুন্দর লোকেশন, দুর্দান্ত কোরিওগ্রাফি, ভালো মেকআপ-গেটআপ, তুলনামূলক ভালো কালার কারেকশন চোখকে আরাম দিয়েছে। শাকিব খান সব সময়ের জন্য একজন ভালো অভিনেতা এবং এ ছবিতেও তিনি ভালো অভিনয় করেছেন। সেই সঙ্গে সাদেক বাচ্চু, মিজু আহমেদ যথাযথ অভিনয় করেছেন। চিকন আলীও আলাদাভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

তবে ডাবিং না করার কারণে রজতভ দত্তকে তার মতো করে পাওয়া যায়নি। নবাগত বুবলী যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন এই ছবিতে এবং তাকে যথেষ্ট যত্ন করা হয়েছে বোঝা যায়। তবে নতুন হিসেবে রুঢ়ভাবে না বলে এইটুকু বলতেই হয়, আরও অনেক উন্নতি করতে হবে, নিজেকে নিয়ে প্রচুর কাজ করতে হবে।

পরিশেষে এইটুকু বলা যায় আপনি যদি অতি শাকিব খান ভক্ত হন- তাহলে এই ছবিটি হয়তো আপনার ভালোলাগাতেও পারে। ছবিটি পরিচালক শামিম আহমেদ রনির জন্য অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে সুপারস্টার শাকিব খানের জন্য এটি একটি ‘অনুল্লেখযোগ্য’ ছবি হিসেবেই থেকে যাবে বলে মনে হয়!

মোস্তাফিজুর রহমান মানিক।
লেখক: চিত্রপরিচালক। 

/এমএম/

লাইভ

টপ