‘এখন তো দেখি নায়িকারা প্রযোজক নিয়ে আসেন’

Send
ওয়ালিউল বিশ্বাস
প্রকাশিত : ২০:০৪, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৪, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সাবেক সদস্য ও প্রযোজক নাসির উদ্দিন দিলু। ১৫টিরও বেশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। তবে সংগঠক হিসেবে তার ভূমিকা আরও উজ্জ্বল।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশ সমিতিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরপর দুইবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজ করেছেন সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে। বর্তমান কমিটিতে না থাকলেও বিগত চার বছর সেন্সর বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসেব কর্মরত ছিলেন তিনি।
চলচ্চিত্রের চলমান দুঃসময়েও পেছন থেকে নিরলসভাবে কাজ করছেন এই প্রযোজক নেতা। বর্তমানের ঢাকাই চলচ্চিত্রের মন্দাভাব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের নানা কথা তুলে ধরলেন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ নিয়ে আজকের মুখোমুখি-নাসির উদ্দিন দিলু

বাংলা ট্রিবিউন:  চলচ্চিত্র প্রযোজনা, সংগঠন কিংবা সরকারি দফতর সেন্সর বোর্ডে আপনার কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই আলোকে সার্বিক অবস্থা এখন কেমন দেখছেন?
নাসির উদ্দিন দিলু: আমাদের অনেক সেক্টরে ভালো করা দরকার। আসলে কোনোটাতেই কিছু হচ্ছে না। একটা সময় তো বছরের শ’-এর উপরে ছবি মুক্তি পেত। এর এখন সেটা গড়ে ৩৫-৪০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। এখন তো সেন্সর বোর্ডে কয়েক সপ্তাহ পরপর দেশীয় ছবি দেখা হয়। আবার যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণও কমে গেছে।
ছবি তো নির্মাণ করতে হবে, নইলে মানুষ দেখবে কী? আমাদের গল্প, নির্মাণ, টেকনিশিয়ান- অনেক দিকে সমস্যা আছে।
আরেকটা বিষয়, আগে যে জায়গায় হলগুলো ছিল, এখন সেগুলোর দাম বেড়ে গেছে। তাই হলমালিকরা অন্য ব্যবসার কথাও ভাবছেন। আবার হল মেনটেনের যে খরচ, তাও ব্যয়বহুল। তাই ছবি দেখানোর জায়গা কমে গেছে। যার ফলে প্রযোজকরাও ঝুঁকিতে। আবার যৌথ প্রযোজনাতেও এমন কিছু নিয়ম করে রেখেছে, যেখানে প্রতিবেশী দেশ আগ্রহ হারাচ্ছে। প্রথমেই কঠিন হয়ে তো লাভ নেই, নিজেদের আগে বাঁচতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এখন তো নীতিমালায় সমভাব রাখা হয়েছে। কোন কোন জায়গাগুলো বাধা সৃষ্টি করছে?
নাসির উদ্দিন দিলু: একসময় আমরাও যৌথ প্রযোজনায় ছবি করেছি। তখন আমরা ছিলাম প্রথম পার্টি আর ওরা (ভারত) দ্বিতীয় পার্টি। এখন তো হয়ে গেছে উল্টো। ওরা বেশি টাকা দিচ্ছে। ওদের  গ্রহণযোগ্য তারকার সংখ্যা বেশি। গল্প ও নির্মাণেও তারা অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে তাদের টেকনিশিয়ানরা ভালো। তাই বাস্তবতাও মানতে হবে।
কিছুদিন আগে যে নীতিমালা হয়েছে, আমার তো মনে হয় না আর কোনও যৌথ প্রযোজনার ছবি হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিএফডিসির ভেতরে ও বাইরের নির্মাতাদের মধ্যে একটা পার্থক্য উঠে আসে। বিশেষ করে দেখা যায়, এফডিসির যারা নিয়মিত নির্মাতা তারা বাইরের লেখকের গল্প নিতে চায় না। আসলে কি বাইরের লেখকরা এফডিসির মতো করে লেখতে পারে না নাকি এফডিসির নির্মাতার বাইরের লেখকের গল্প নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না?
নাসির উদ্দিন দিলু: আসলে গল্প না, চিত্রনাট্য তৈরি করাটা এখানে ফ্যাক্টর। একজন নির্মাতা কীভাবে গল্পটা উপস্থাপন করছেন বা প্রযোজক কতটা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন, এটা বিষয়।
আবার সেটা পর্দায় কতটা সুন্দরভাবে আর্টিস্ট উপস্থাপন করছেন- এগুলোও বিষয়। এখন তো দেখি নায়িকারা প্রযোজক নিয়ে আসেন। তখন বাধ্য হয়ে সেই নায়িকাকে নিতে হয় পরিচালকের। যখন ছবি দেখি, তখন বুঝতে পারি, তিনি আসলে কোনোভাবেই নায়িকা হওয়ার যোগ্য নন। সেন্সর বোর্ডে অনেক ছবিই দেখি। কোয়ালিটি ছবি বলতে কিছুই নেই। বছরে দুই একটা ছবি ভালো হয়। কিন্তু দু’একটা ছবি দিয়ে তো পুরো ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না।
নাসির উদ্দিন দিলুবাংলা ট্রিবিউন: আপনি সেন্সর বোর্ডের কথা বলছিলেন। ছবি দেখার অভিজ্ঞতায় আপনার কী মনে হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা দেখেন?
নাসির উদ্দিন দিলু: সবক্ষেত্রেই। গল্প, পরিচালনা, নির্মাণ, শিল্পী- সবক্ষেত্রে অবস্থা খুব খারাপ।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি নিজেও প্রযোজক। ১৫-১৬টি ছবি প্রযোজনা করেছেন। আপনি নিজেও তো প্রযোজনায় ফিরতে পারেন। সেটা ভাবছেন না কেন?
নাসির উদ্দিন দিলু: আর কত লসের মধ্যে পড়ব (হাসি)। যদি মূল লগ্নি করা টাকাও ফিরে আসত আমি সিনেমা নির্মাণ করতাম। কিন্তু এই বয়সে এসে আর লসের মধ্যে পড়তে চাই না।
বাংলা ট্রিবিউন: হলের টাকা প্রযোজকের কাছে ফিরে না আসার অভিযোগও আছে...
নাসির উদ্দিন দিলু: আগেও হলের টাকা প্রযোজকদের কাছে পুরোপুরি আসত না। আগে আমাদের ছিল থার্টি ফাইভ ফিল্ম। এখন তো অনেককিছু ডিজিটাল হয়েছে। অনেক কিছুর বাড়তি ভাড়া দিতে হয়। মেনটেইন করতে হয়। আগে এই টাকা লাগত না। যা আসত ফিফটি ফিফটি। এখন এই ভাড়াগুলো আরও দুরূহ করে তুলেছে। আসল কথা হলো, ছবির কোয়ালিটি থাকতে হবে। ভালো ছবি হতে হবে।
আরেকটা বিষয়, দর্শকরা এখন অনেক হলবিমুখ হয়ে গেছেন। অনেক আমদানি ছবি আসছে। কিন্তু সেগুলোও তারা দেখছেন না।
বাংলা ট্রিবিউন: এর কারণ কী হতে পারে?
নাসির উদ্দিন দিলু: যদি আমদানি করা ছবির কথা বলি, ওগুলো ভারতে মুক্তির কয়েক মাস পর এদেশে আসে। এটাও একটা কারণ হতে পারে। আবার ব্যস্তজীবনে অনেকেই সময় বের করতে পারছেন না। একসময় কলকাতায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছিল। প্রায় ২০-২৫ বছর আগের ঘটনা। তখন তাদের ছবির বাজেট ছিল ২০-২৫ লাখ টাকা। সেটা বাড়তে বাড়তে এখন ৭-৮ কোটি টাকা হয়েছে। তখন পজিটিভ দিক ছিল, তাদের হল সংখ্যা বেশি ও পরিবেশও ভালো ছিল। তাই আমাদের জন্য এই সময়টা খুবই চ্যালেঞ্জের।
নাসির উদ্দিন দিলুবাংলা ট্রিবিউন: আমদানির প্রসঙ্গ যেহেতু এলো, একটা কথা বলা দরকার। ভারতীয় নতুন ছবি এদেশে আসে আর পাঠানো হয় বাংলাদেশের পুরনোর ও বাজে মানের ছবি। এটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন?
নাসির উদ্দিন দিলু: একটা সময় অনেকেই খারাপ বা পুরনো ছবি পাঠিয়েছেন। তবে এখন পরিবর্তন এসেছে। গত ২৯ নভেম্বর ভারতে গেছে আলমগীরের ‘একটি সিনেমার গল্প’। খুব ভালো ছবি এটা। আবার দেবের ‘পাসওয়ার্ড’ বাংলাদেশে এসেছে। এর পরিবর্তে গেছে শাকিব খানের ‘মাই নেম ইজ খান’। আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এতক্ষণ তো সমস্যা নিয়ে অনেক কথা হলো। যদি এগুলোর সমাধান খোঁজেন তাহলে কোন কোন বিষয়ে কাজ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
নাসির উদ্দিন দিলু: দুটি কাজ করতে হবে। ছবির মান ও হলের পরিবেশ উন্নয়ন। যেন দর্শকদের মধ্যে সন্তুষ্টি আসে। এ দুটো নিয়ে যা যা করণীয় তা করতে হবে। তাহলে বেশিরভাগ সমস্যা এমনিতেই দূর হয়ে যাবে।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এমএম/

লাইভ

টপ