স্মরণে বাসুদেব ঘোষবাসায় আর আসা হলো না বাসুর

Send
কুমার বিশ্বজিৎ, সংগীতশিল্পী
প্রকাশিত : ১৭:১৫, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩১, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯

বাসুদেব ঘোষ ও কুমার বিশ্বজিৎসময়ে অসময়ে বাসু আর ফোন করবে না। আবদার জড়ানো কণ্ঠে বলবে না, ‘বিশ্বদা আপনার কথা ভেবে একটা গান করেছি। গেয়ে দিতে হবে। আমি কালই আসছি ট্র্যাক নিয়ে।’ এই বলে আবার নিরুদ্দেশ হবে না বাসু! এবার তো আজীবনের জন্যই ও নিরুদ্দেশ হলো। আর কোনও আবদার করবে না।
আমি যেখান থেকে এসেছি, বাসুরও সেই একই শেকড়। প্রিয় চট্টগ্রাম। শুধু মিউজিককে ভালোবেসে আমরা এতটা পথ পাড়ি দিয়েছি, এসেছি ঢাকায়। পেছনের সবটুকু ফেলে এসেছি, এই সংগীতটাকে লালন করে। বাসুর তো এই সংগীতের বাইরে আর কোনও প্রেম বা সম্বল ছিল না। ২৪ ঘণ্টাই সে থাকতো গান তৈরির ধ্যানে। সেই মানুষটা মাত্র ৫১ বছর বয়সে যদি চলে যায় হুট করে, সেটা কার ক্ষতি? ওর কোনও ক্ষতি নেই। ক্ষতিটা আমার অথবা বাংলাদেশের।
বাসুর মৃত্যুর খবর পেয়ে এসব কথাই ঘুরেফিরে ভাবছি। কিছুদিন আগে নিজের মাকে হারালাম। ভাবছি, এই বছরটা সংগীতের এতো এতো মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেন? একদিকে গান বানানোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে গানের কারিগরেরা চলে যাচ্ছে একে একে। বড্ড একা লাগে আজকাল। ভয় হয়।
বাসুর সঙ্গে আমার বেশি কাজ করা হয়নি। আমাদের শুরুটা ছিল ‘এক কথার চিঠি’ অ্যালবাম দিয়ে। ২০০১ সালের কথা। আমার একক অ্যালবাম। ওটার টাইটেল গানই করেছে বাসু। আহা কী সুন্দর সুর-সংগীত। কানে বাজে এখনও। কিছুদিন আগেও আমাকে ফোন করেছে। ধরতেই বলে, ‘দাদা একটা দেশের গান করেছি আপনার জন্য। আর কাউকে দিয়ে হবে না। গাইতে হবে। আমি বাসায় আসছি।’ বাসায় আর আসা হলো না বাসুর।
মানুষ বয়স হয়ে, রোগে পড়ে বলে কয়ে না-হয় চলে যায়। কিন্তু বাসুর মতো এমন হঠাৎ চলে যাওয়া খুবই বেদনার। যেভাবে গেছে বাচ্চু, কদিন আগে গেল পৃথ্বীরাজের মতো বাচ্চা ছেলেটাও। এখন তো দেখছি বেঁচে থাকাটাই একটা কষ্টের বিষয় হয়ে যাচ্ছে। একে একে সবাই চলে যাচ্ছে।


কিছু সুরকার-শিল্পী থাকেন গানটাকে নেয় বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে। যে বরাবরই ছোটে হিটের দিকে। যদিও হিট হওয়া না হওয়া ওপরওয়ালার হাতে। আর কিছু মানুষ আছে, হিট-ফ্লপ, শ্রোতা কী শুনতে চায়, প্রযোজক কী চায়−এসবের কোনও তোয়াক্কা করে না। বাসু হলো সেই জাতের মিউজিশিয়ান। সে বরাবরই গান করেছে নিজের আত্মার ক্ষুধা মেটানোর জন্য। বাণিজ্যের জন্য নয়। ফলে তার সৃষ্টি অসংখ্য গান জনপ্রিয় না হলেও সেগুলোর কাব্যময়তা, সুর কিংবা সংগীতায়োজন−বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। এগুলো শ্রোতারা হয়তো টের পায়নি, পাবে না। কিন্তু আমরা যারা সংগীতের মানুষ, তারা ঠিকই অনুভব করি। বাসু গান করেছে আত্মিকভাবে, আর্থিকভাবে নয়।
দেশে গান বানানো বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু বাসু থেমে ছিল না। তার পিসি খুঁজে দেখুন−হাজারের ওপর গান পাওয়া যাবে। আমি নিশ্চিত। ইন্ডাস্ট্রি থমকে ছিল, সে চলেছে তুমুল গতিতে। এটাই হলো জাতশিল্পীর ধরন।
দেশের ১৭ কোটি মানুষ। এরমধ্যে সংগীতের সঙ্গে সর্বোচ্চ ২০০ মানুষ আছে। যারা প্রপারলি গাইবার চেষ্টা করে, সৃষ্টির চেষ্টা করে, মানুষ তাদের পছন্দও করে। এই ২০০ মানুষকে কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠান বা সমাজ বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করেনি। এরা প্রত্যেকেই তৈরি হয়েছে নিজের তাগিদে, ঈশ্বরের সমর্থনে। কেউ তৈরি করেনি বাসুদেব কিংবা কুমার বিশ্বজিৎকে। এই গুটিকয় মানুষ ১৭ কোটি মানুষকে প্রতিনিয়ত মনের ক্ষুধা মেটাচ্ছে তাদের কণ্ঠ-সুরে-মেধায়। কারণ, সুর ছাড়া কোনও মানুষ বাঁচতে পারে না। প্রতিটি মানুষেরই সুরের প্রয়োজন পড়ে।  
কষ্ট হয়, যখন দেখি এই সুর সৃষ্টির মানুষগুলো প্রতিনিয়ত অবহেলা কিংবা অপমানের শিকার হন। অথচ এই ২০০ মানুষকে আমাদের সবার লালন করার কথা। সেটা না করে, কারণে অকারণে আমরা গলিও দেই। আমি এটা সবমিলিয়ে বলছি, বাসুর জন্য বলছি না।
* সংগীত পরিচালক বাসুদেব ঘোষ আর নেই
আমার একটাই অনুরোধ সবার কাছে, এই সুরের মানুষগুলোকে আপনারা সরাসরি কোনও উপকার না করেন, অন্তত তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা অপমান করবেন না। আমরা সরাজীবন আপনাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে যাই। বিনিময়ে একটু ভালোবাসা চাই। আপনারা যদি আমাদের লালন না করেন, তাহলে এই সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে। অভিমান নিয়ে বাচ্চু-বাসুদেবেরা এভাবেই হুট করে চলে যাবে। বিদেশ সংস্কৃতি আপনাদের বুকে টেনে নেবে। আমার জীবদ্দশায় এটুকু অন্তত দেখে যেতে চাই না।
যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস প্রিয় বাসু...।
অনুলিখন: মাহমুদ মানজুর

/এমএম/এমএমজে/

লাইভ

টপ