বিশ বিশেষতাতে আলকাতরা কিন্তু বিরিয়ানি হয়ে ওঠে না!

Send
আশফাক নিপুণ, নির্মাতা
প্রকাশিত : ১১:০৩, জানুয়ারি ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, জানুয়ারি ০১, ২০২০

নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে দশ-এর দশক শেষ হলো (২০১০-২০১৯)। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এটি মূলত শূন্যতার দশক। দশে ধ্স—এভাবেও বলছেন কেউ কেউ। সিনেমা, সংগীত, টিভি এমনকি মঞ্চেও নেই উল্লেখযোগ্য কোনও অর্জন। সঙ্গে চলে গেছেন অনেক গুণিজন। তবে শুরু হওয়া নতুন বছর কিংবা বিশ দশক (২০২০-২০২৯) নিয়ে প্রত্যাশার গল্পও শোনাচ্ছেন অনেকে।
বিশে (২০) বিষক্ষয়—এভাবেও মূল্যায়ন করছেন কেউ কেউ। বলছেন, এই বছর থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আসবে গুণগত পরিবর্তন। সুরাহা হবে বেশিরভাগ সমস্যার। বিশ দশক হবে দেশীয় সংস্কৃতির বৈপ্লবিক জাগরণের। আবার এমনও অনেকে আছেন, যাদের কণ্ঠে হতাশার সুর। বলছেন—দশক কিংবা নতুন বছর বলে কথা নয়। ক্যালেন্ডার বদলালেও কাজের পার্থক্য ১৯ আর ২০! মানে সামান্যই।
‘দশে ধ্স’ আর ‘বিশে বিষক্ষয়’ অথবা ‘১৯/২০’ বিষয়ে সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগের উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা নিজেদের পর্যালোচনা তুলে ধরলেন বাংলা ট্রিবিউন-এর বিশেষ এই আয়োজনে।

শুটিংয়ে আশফাক নিপুণ২০১৯ চলে গেলো। আমরা প্রবেশ করলাম নতুন এক দশকে। মনে হচ্ছে, ভারে নুয়ে পড়া ২০১৯ গত এক দশকের চাপ বইতে বইতে অবশেষে বুঝি ভারমুক্ত হলো!
যেকোনও শুরুরই মূল্যায়ন হয় তার শেষটা দিয়ে। ২০১৯ দিয়েই হয়তো গত এক দশককে অনুমান করা যাবে। টেলিভিশনে গত দশকের শুরুটা তো ভালোই ছিল। শেষটা (২০১৯) কেমন হলো?
গত এক দশকে টেলিভিশনের দর্শকপ্রিয়তা থেকে দর্শকশূন্যতা—সবই দেখেছি আমরা। টেলিভিশন একসময় ছিল ছোট পর্দা। ইউটিউব চলে আসার পরে সেটি হয়ে গেলো মেজ পর্দা! বাসার ছোট ছেলেটার আবদার মেটানোর প্রতি সংসারের সবার যেমন বাড়তি খেয়াল থাকে, দর্শকেরও মনোযোগের মূল আকর্ষণ ছিল এই ইউটিউবের প্রতিই। ভিডিও ফিকশন, টেলিফিল্ম, অনুষ্ঠান টিভিতে প্রচার হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ দর্শক সেগুলো দেখেছে ইউটিউবে। এরপর প্রচুর ইউটিউব চ্যানেল হয়েছে যারা সারা বছর জনপ্রিয় তারকাদের দিয়ে নাটক বানিয়ে প্রচার করেছে সেসব চ্যানেলেই। তবে আমাদের দেশের দর্শক এখনও দুই ঈদ এবং ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে বানানো ভিডিও ফিকশন আর টেলিফিল্মের প্রতিই আস্থা রাখেন। সেটা যে মাধ্যমেই প্রচার হোক না কেন, এই ব্যাপারটাও লক্ষণীয়।
বাসার ছোট ছেলের আবদার মেটানোর যে কথা বলছিলাম সেই আবদারের মাত্রা যখন বেশি হয়ে যায় তখন আদর সোহাগও কিছুটা কমে আসে। সেটাও হয়েছে ২০১৯-এ! মাত্র বছর দুয়েক আগেও যেভাবে আমরা দেখেছি ‘বড় ছেলে’, ‘বুকের বাঁ পাশে’ প্রচারের পরপরই সাড়া ফেলে দিলো টেলিভিশন ও ইউটিউবে (ভিউজে), গত বছর সেরকম তুমুল জনপ্রিয় কোনও টিভি প্রোডাকশন পাওয়া যায়নি। আগে হয়তো ৩ দিনে ইউটিউব ভিউজ হতো ১০ লাখ, গত বছর সেটা হয়েছে ১০ থেকে ১২ দিনে। হওয়ার পরে গতিও ছিল স্তিমিত। এর কারণ কী? গতানুগতিক গল্পের মাত্রাতিরিক্ত প্রোডাকশনে দর্শক কি কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছে ইউটিউবের প্রতিও? তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের অভিযোগ।
শিল্পে শ্লীল-অশ্লীল আপেক্ষিক বিষয়, তবে প্রায়োগিক দক্ষতা আর নির্মাণে সাধারণ চোখে আপত্তিকর দৃশ্য বা সংলাপও হয়ে উঠতে পারে নান্দনিক। সেদিকে খেয়াল রাখার দায়িত্ব নির্মাতার, দায়ও তারই।
গত বছর ভিডিও প্রোডাকশন নির্মাণে আরেকটি প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব এবং বিস্তার দেখা গেছে যেটাকে ‘OTT প্ল্যাটফর্ম’ বলে। যেখানে দর্শক ইউটিউবের মতো ফ্রি দেখতে পায় না, অ্যাপ ডাউনলোড করে একটা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে সাবস্ক্রিপশনের পর সেটি দেখতে হয়। বায়োস্কোপ, বঙ্গবিডি আগে থেকেই বাজারে ছিল, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রবি টিভি প্লাস, সিনেস্পট, বাংলাফ্লিক্স এবং ভারতীয় হৈচৈ। এদের অর্থায়ন এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনেক ভিডিও প্রোডাকশন নির্মিত হয়েছে যার বেশিরভাগই মানসম্পন্ন বলেই প্রশংসা করেছেন ভিডিও ফিকশন অনুরাগীরা।
তবে এসব প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—আমাদের দর্শক এখনও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি ফি দিয়ে সাবস্ক্রাইব করে অনুষ্ঠান দেখার। তার ওপর দেশের বাইরে এসব স্ট্রিমিং সাইটগুলো চলে না। কাজেই বিদেশে বসবাসরত বিশাল বাঙালি দর্শকগোষ্ঠীর বরাবরই অভিযোগ থাকে এসব প্রযোজনার প্রতি। নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম বা হৈচৈ-এর মতো আমাদের দেশের অ্যাপগুলো যদি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না হয়ে অমুক কোম্পানির সিম কিনলে অমুক অ্যাপে দেখা যাবে ব্যবস্থায় চলতে থাকে, তাহলে OTT প্ল্যাটফর্ম কখনোই জনপ্রিয় হবে না। নির্মাতা, অভিনেতারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এসব প্রোডাকশনে কাজ করতে।
শুটিংয়ে আশফাক নিপুণ (চেয়ারে)ভালো লেখনীর সংকট আগের বছরগুলোর মতো জারি ছিল গত বছরও। টেলিভিশন বরাবরই চিত্রনাট্যকার, গল্পকারের মাধ্যম। আমরা যদি লেখকদের আগ্রহী করে তুলতে না পারি, তাদের প্রাপ্য সম্মান আর সম্মানী না দেই, তাহলে যত বড় বাজেটের কাজই হোক না কেন সেটা চাকচিক্যময় হবে, কিন্তু তাতে প্রাণ থাকবে না। আরও  একটা ফেনোমেনা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেটা হলো ইউটিউব ভিউজ। ফ্রিতে কতজন মানুষ একটা ভিডিও দেখল, সেটা থকে ভালো মন্দ নির্ণয় করা বুদ্ধিমানের কাজ না। কথায় বলে বাঙালি ফ্রি পেলে আলকাতরাও খায়। তাতে আলকাতরা কিন্তু বিরিয়ানির সমকক্ষ হয়ে ওঠে না। যে কোনও কাজের জনপ্রিয়তা নির্ভর করে সেটা তৎক্ষণাৎ কতজন দেখলো তার ওপরে নয়, সেই কাজ কত মাস-বছর ধরে মানুষ মনে রাখলো তার ওপরে।
এইসব মিলিয়ে ২০১৯ ছিল কিছুটা কনফিউশনের বছর। প্রযোজক, নির্মাতারা দোলাচলে ছিলেন টিভি, ইউটিউব এবং স্ট্রিমিং অ্যাপের দর্শক টানা-হেঁচড়ায়। দর্শকের মতিগতিও পেণ্ডুলামের মতো দুলেছিল সবসময়। এটাও বা কম কী! থেমে তো আর যায়নি।
২০২০ টোয়েন্টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের মতো মারকুটে কিন্তু স্বল্পমেয়াদি বিনোদন না হয়ে টেস্ট ক্রিকেটের মতো দীর্ঘমেয়াদি মজবুত আর টেকসই কিছুর সূচনা করুক- সেটাই প্রত্যাশা করি।
হ্যাপি নিউ ইয়ার।

/এমএম/এমএমজে/

লাইভ

টপ