...তাই আপনাকে অশ্লীল লাগছে!

Send
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
প্রকাশিত : ২৩:৩৯, জুন ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:২৪, জুন ১১, ২০২০

মাসুদ হাসান উজ্জ্বলহতে এসেছিলাম ফিল্মমেকার, এখন ঘরবন্দি হয়ে পড়ে আছি—তাই কথা বলাই সার! চলচ্চিত্র বা ওয়েব সিরিজে যৌনতা নিয়ে জাতি এখন দু’ভাগে বিভক্ত। একপক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করেই চলেছে সমানে! আমি নাদান মানুষ, বুঝি কম। তাই কোনও বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত না দিয়ে পর্যবেক্ষণ শেয়ার করার চেষ্টা করি। আর সহজাত কৌতূহল থেকে বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করারও চেষ্টা করি!

প্রথম কথা হলো, চলচ্চিত্র নির্মাণে আমরা কতটা সাবালক হয়েছি সেটা দেখা দরকার সবার আগে। আমরা সম্ভবত এখনও কোনও নিজস্ব সিনেমা-ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হইনি! অবাস্তব মারপিট-ধর্ষণের ছবি বানানোর সময় তামিল বা হিন্দি ছবির আদলে বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করি। আর বিদেশি পুরস্কারের জন্য ইরানি বা কোরিয়ান ছবির ন্যারেটিভ ফলো করি! ফলে আমরা যে কম-বেশি ধার করা বুদ্ধিতে চলি, এটা প্রথমেই মেনে নেওয়া উচিত।
আমি যেহেতু টুকটাক সিনেমা বানানোর চেষ্টা করছি, সেই সুবাদে নিজের একটা পদ্ধতি শেয়ার করি। আমি সাধারণত কোনও দৃশ্য ফাঁদি না, দৃশ্য যদি সহজাতভাবে আমার কাছে ধরা দেয় তাহলে সেটাকে বিশ্বাস করে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। সুতরাং একটা কাজ করতে গিয়ে এই প্রশ্নটা থেকেই যায়, কাহিনির প্রয়োজনে দৃশ্য, নাকি দৃশ্যের প্রয়োজনে কাহিনি?
এখন একটা ছবিতে যদি মনে হয়, নায়ক-নায়িকা একটু পর পর চুমু খাবে আর বিছানায় চলে যাবে, তাহলে নির্মাতার ভাবনার সততা বা সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়!
সবার মতো আমারও অল্প-বিস্তর বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তো বিদেশে গিয়েও মনে হয়েছে মানুষের করবার মতো যথেষ্ট কাজ রয়েছে। কথায় কথায় চুমু খাওয়া বা বিছানায় চলে যাওয়ার মতো এত সময় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষেরই নেই! তাই বলে কেউই যে এমনটা করে না, তা কিন্তু আমি বলছি না।
তবে বৃহদার্থে ঘটা ঘটনা ছাড়া তো আমরা সেটাকে সামাজিক বাস্তবতা বলি না, তাই না?
যৌনতা মানুষের জীবনের একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। সকালবেলা প্রাতঃকৃত্য সারবার মতোই নৈমিত্তিক ঘটনা। তবে প্রাতঃকৃত্যের সঙ্গে যৌনতার একটা বিরাট পার্থক্য হলো, আপনি প্রাতকৃত্য না সেরে বাঁচতে পারবেন না, কিন্তু যৌনতা ছাড়াও বাঁচা সম্ভব। অনেকেই দিব্যি বেঁচে থাকেন এই কর্ম ছাড়া!
উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় এক ধরনের গোপন অভিযানের মতো উত্তেজনা নিয়ে বাড়ির ছাদে লুকিয়ে হুমায়ূন আজাদের ‘নারী’ গ্রন্থখানা পড়েছিলাম! সেটা পড়ে উত্তেজিত বোধ করাতো দূরের কথা, এক ধরনের ভীতির উদ্রেক হয়েছিল! মনে হয়েছিল যৌনতা রকেট সায়েন্সের চেয়ে জটিল কিছু!
তবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে যখন এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, তখন সেটাকে রকেট সায়েন্স অন্তত মনে হয়নি! নিতান্তই ব্যক্তিগত বিষয়টা কে কীভাবে উপভোগ করতে চায়, এটা একান্তই তার রুচি ও চাহিদার বিষয়, এটা নিয়ে কোনও তর্ক চলে না!
তবে ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, ধরেন দিন শেষে বিষয়টা তো শারীরিক এবং মানসিক। যেহেতু শরীরের বিরাট একটা ভূমিকা এখানে রয়েছে সুতরাং ব্যক্তিবিশেষের শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টা এখানে চলেই আসে। সেটা নারী বা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সত্য। তো ধরেন, তসলিমা নাসরিন বলেই দিলেন নারীর সীমাহীন যৌনক্ষুধার কথা। সেটা কি সব নারীর ক্ষেত্রেই সত্য? উপভোগের পরে ক্লান্তি কিন্তু যেকোনও মানুষের শরীরের জন্য স্বাভাবিক পরিণতি! সবার নিশ্চয়ই মানসিকতা বা অ্যানার্জি লেভেল এক নয়! এ কারণেই যারা উন্মাদ পর্যায়ে যৌনতা উপভোগ করতে চায় তারা বিভিন্ন মাদকের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন।
নাটক সিনেমা নিয়ে কথা বলতে এসে যৌনতা নিয়ে এতবড় বয়ান দিলাম একটা নির্দিষ্ট কারণে!
আমার সবসময় মনে হয় যৌনতার মতো একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে যুগ-যুগান্তর ধরে অতিচর্চা সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করেছে। ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা তো কম নয় বিশ্বব্যাপী! ভাবুন তো, আপনি যদি মহা পালোয়ানও হয়ে থাকেন তাহলেও তো সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা, দানব পর্যায়ের পালোয়ান হয়ে থাকলে দুই ঘণ্টা। সেটার জন্য একটা মানুষকে খুন করে ফেলতেও তো দ্বিধা করে না কতো কতো নরপিশাচ!
শয্যার ঘটনা অকপটে স্বীকার করতে পারাটাকে বিরাট আধুনিকতা মনে করে বসলে তো মহামুশকিল! আধুনিকতার মানদণ্ড উন্মুক্ত যৌনাচার বলে কোনোকালে কোনও দার্শনিক দাবি বা প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই।
এখন আসা যাক চলচ্চিত্রে যৌনতা প্রসঙ্গে। হলিউড বা ইউরোপিয়ান ছবিতে যৌনতা কিন্তু একটু একটু করে প্রবেশ করেনি, শুরু থেকেই খুব স্বাভাবিকভাবেই ছিল। সুতরাং এসব চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত যৌনতা কোনোকালেই দৃষ্টিকটু বা অশ্লীল মনে হয়নি। ওই যে শুরুতেই বলেছি, যা কিছু আপনার সহজাত, তা সাধারণত দৃষ্টিকটু লাগে না!
এখন আমরা চলচ্চিত্রে যৌনতা প্রদর্শন করতে গেলে অশ্লীল তো লাগবেই- যুগ যুগ ধরে যৌনতা নিয়ে হাজারো ট্যাবু রয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে। সেটা পাশ কাটিয়ে যখনই আপনি শয্যাদৃশ্যে অভিনয় করতে চলেছেন, বংশ-পরম্পরায় প্রবাহিত সংস্কার আপনার দেহের অভিব্যক্তিতে প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে! যেহেতু বিষয়টি আপনার এবং ভেতরকার আপনার সঙ্গে মানানসই নয়, তাই আপনাকে অশ্লীল লাগছে!
একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সংস্কৃতি কিন্তু দু-দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না, সুতরাং সেটার বৈপ্লবিক পরিবর্তনও দু-দিনে ঘটবে না। কালের এক ধরনের সহজাত প্রবহমানতা রয়েছে, সবকিছু তাড়াহুড়ো করে সময়ের আগেই কেন ঘটিয়ে ফেলতে হবে! সংস্কৃতি তার নিজস্ব গতিতেই বদলাক- সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদে পড়ে আবশ্যিক না হয়ে উঠুক!
মাই ফেলো ফিল্ম মেকার্স- আমি জানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মাত্রই সমাজকে নাড়া দিতে ভালোবাসেন। যৌনতা এই বিপ্লবের অতিক্ষুদ্র একটি উপকরণ! পর্নোগ্রাফি লুকিয়ে না দেখে সিনেমা হলে আয়োজন করে দেখলেই বিপ্লব ঘটে গেলো দাবি করার মতো এতটা লঘু আপনাকে আমি মনে করতে চাই না! এয়ারপোর্টের ইউরিনালে মূত্র বিসর্জনের সময় মনের অজান্তেই দুই দিকে তাকিয়ে দেখেন কেউ দেখে ফেললো কিনা! আপনার নিজের মনের সংস্কার কিন্তু এখনও দূর হয়নি, তাই আপনাকে দিয়ে এই বিপ্লবটি ঘটিয়ে ফেলার সময় সম্ভবত এখনও আসেনি!
শেষ করতে চাই একটা অফ-টপিক দিয়ে! সাম্রাজ্যবাদীরা হাজারো অস্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে চলেছে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। সেই ধারাবাহিকতায় একবিংশ শতকের সবথেকে সফল সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্র হলো সকল মানুষের প্রাইভেসি নিজেদের দখলে নেওয়া। আমার আপনার এখন আর কোনও গোপন বিষয় নেই, সমস্ত কিছু গুগল আর ফেসবুক জানে। সেদিন দূরে নয়, যেদিন আপনি আপনার একান্ত শয্যাদৃশ্য লাইভ করে চরম বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়ার নামে চূড়ান্ত দাসত্ব বরণ করে নেবেন।

লেখক: নির্মাতা, সংগীতশিল্পী, চিত্রকর ও সমালোচক



[সম্পাদক নোট: সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ওয়েব সিরিজ নিয়ে ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ উঠেছে। সিনেমা বা সিরিজ নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের প্রতিক্রিয়া অন্যগুলোকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এমন বোল্ড কনটেন্ট এর আগে প্রডিউস হয়নি এই বাংলায়। তাই চলমান করোনাকালেও সোশ্যাল মিডিয়ায় শিল্পী-নির্মাতা-দর্শকরা এখন ব্যস্ত ও বিভক্ত ‘শ্লীল’ আর ‘অশ্লীলতা’ নিরূপণে।]

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ