সমালোচনার জবাবে আলাপ

শিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা

মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০

শুক্রবার বাংলা ট্রিবিউনে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক বিধান রিবেরু ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের একটি শিল্পসম্মত, মনোযোগী এবং চিন্তাপ্রসূত পর্যালোচনা লিখেছেন। তাঁর প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সমালোচনা শিল্পের স্বাভাবিক পরিণতি; বরং কোনো শিল্পকর্ম যদি প্রকৃত অর্থে আলোচনা, বিতর্ক কিংবা মতভেদের জন্ম না দেয়, তবে তার অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

বনলতা সেন: কাব্যিক অন্বেষণের চলচ্চিত্র  শিরোনামে প্রকাশিত সমালোচনার জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করা সাধারণত দুর্বলতার লক্ষণ। শিল্পকর্ম একবার দর্শকের কাছে পৌঁছে গেলে তার ব্যাখ্যার অধিকার নির্মাতার একার থাকে না। সুতরাং এই লেখাকে আত্মরক্ষার প্রয়াস হিসেবে নয়, বরং ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রের কিছু নন্দনতাত্ত্বিক ও দার্শনিক দিক নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপ হিসেবে বিবেচনা করাই সমীচীন।

বাংলাভাষী সমাজে রবীন্দ্রনাথ এমন এক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যাঁকে ঘিরে সংবেদনশীলতা প্রায় ধর্মীয় মাত্রা লাভ করেছে। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়; বরং ঐতিহাসিকভাবেই ব্যাখ্যাযোগ্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার শিল্প-সংস্কৃতিতে মহৎ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে প্রতীকী পুনর্নির্মাণ, পুনর্ব্যাখ্যা কিংবা উল্টোপাঠের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই স্বাভাবিক শিল্পচর্চার অংশ। 

সেখানে চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি সম্বলিত অন্তর্বাসও পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে কেউ মনে করেন না যে বিপ্লব বা বিপ্লবীকে অপমান করা হয়েছে। কারণ শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিকে নয়, ব্যক্তির প্রতীকী শক্তিকে ব্যবহার করে।

আমাকে যদি ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করতে বলা হতো, তাহলে আমি সম্ভবত প্রথমেই এর মৌলিক কাঠামো নিয়ে কথা বলতাম। বিশেষত এর ফ্রেমিং এবং আলোক পরিকল্পনা নিয়ে।

‘বনলতা সেন’-এর ফ্রেমিং ডিজাইন মূলত ফ্রেমের ভেতরে আরেক ফ্রেম ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। দরজা, জানালা, করিডর, ট্রামের জানালা, হাসপাতালের কক্ষ, আয়না কিংবা স্থাপত্যের রেখা—সবকিছু মিলিয়ে দর্শককে ক্রমাগত আরেকটি দৃশ্যস্তরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে শুধু নান্দনিকতা নয়, একটি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ভাবনাও কাজ করেছে।

বৈজ্ঞানিক অর্থে মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি বাস্তবতাকে অনুভব করে না; বরং বাস্তবতার একটি মানসিক মডেল নির্মাণ করে। সেই মডেলের ভেতরে আবার স্মৃতি, কল্পনা এবং আত্ম-ব্যাখ্যার আরেকটি মডেল তৈরি হয়। ফলে আমরা বাস্তবতার মধ্যে নয়, বাস্তবতার বহুস্তরীয় প্রতিফলনের

দর্শক যখন একটি শটের দিকে তাকান, তিনি কেবল একটি দৃশ্য দেখেন না; তিনি সেই দৃশ্যের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকেন, আবার তারও ভেতরে। ফলে এক ধরনের অস্তিত্বগত অস্বস্তি তৈরি হয়। মনে হয় যাত্রা চলছে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না। আমার কাছে জীবনানন্দের কবিতার অভিজ্ঞতাও অনেকটা এমনই—একটি অন্তহীন করিডর, যার শেষ নেই, কেবল আরও গভীরে প্রবেশের আছে।

একইভাবে চলচ্চিত্রটির আলো কেবল আলোকপ্রক্ষেপণ নয়; এটি একটি অভিব্যক্তির মাধ্যম। মানুষের মস্তিষ্কে আলো এবং ছায়া শুধু বস্তুকে দৃশ্যমান করে না, তার আবেগগত অর্থও নির্ধারণ করে। ‘বনলতা সেন’-এ আলোকে বাস্তবতার অনুকরণে ব্যবহার করা হয়নি; বরং স্মৃতি, অনুপস্থিতি, আকাঙ্ক্ষা এবং অস্তিত্বগত নিঃসঙ্গতার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। 

অনেক ক্ষেত্রে আলো চরিত্রকে প্রকাশ করে না, বরং আড়াল করে। দার্শনিক অর্থে আলো এখানে জ্ঞানের প্রতীক নয়; অনুসন্ধানের প্রতীক। আর অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক নয়; সম্ভাবনার প্রতীক। জীবনানন্দের কবিতার মতোই এখানে কোনো কিছু সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয় না। সবকিছু আংশিক দৃশ্যমান, আংশিক অদৃশ্য।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মহীন। অনেকেই হয়তো বিষয়টি লক্ষ্য করেননি যে মহীন কোনো বাস্তব চরিত্র নয়; সে জীবনানন্দ দাশের অল্টার ইগো। চরিত্রটির উৎস জীবনানন্দের ‘ঘোড়া’ কবিতা। সেই কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—“প্রস্তর যুগের ঘোড়া যেন এখনো ঘাসের লোভে চরে—পৃথিবীর কিমাকার ডায়নামোর পরে।” এই একটি পংক্তির মধ্যেই জীবনানন্দ সময় সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। প্রস্তর যুগ মানে নব্য প্রস্তর যুগ; আর ডায়নামো উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লব-উত্তর প্রযুক্তির প্রতীক। হাজার হাজার বছরের ব্যবধান একটি মাত্র চিত্রকল্পে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে। যেন সময় সরলরৈখিক নয়; বরং স্তরায়িত।

‘বনলতা সেন’-এর মহীনও সেই অর্থে কোনো মানুষ নয়; সে সময়ের এক ভাসমান রূপ। তার অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যৎও নেই। সে কেবল স্মৃতির মধ্যে বিচরণ করে। তার জন্য সময় একটি নদী নয়; একটি সমতল ভূমি, যেখানে প্রস্তর যুগের একটি ঘোড়া এবং আধুনিক সভ্যতার একটি ডায়নামো একই সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারে। ফলে চলচ্চিত্রটির বর্ণনাও সচেতনভাবে সরলরৈখিক নয়। কারণ জীবনানন্দের কবিতার জগতে সময় ঘড়ির কাঁটা মেনে চলে না; সময় সেখানে স্মৃতির মতো, স্বপ্নের মতো, কখনো একই সঙ্গে বহু শতাব্দীকে ধারণ করে।

আরেকটি বিষয় সম্ভবত স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বিধান রিবেরু তাঁর আলোচনায় ইঙ্গিত করেছেন যে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গি নাকি ফরহাদ মজহারের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত। এই অনুমানটি আমাকে বিস্মিত করেছে।

ফরহাদ মজহার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের একটি পরিচিত নাম। কিন্তু কোনো শিল্পকর্মের দার্শনিক উৎস অনুসন্ধান করতে গেলে বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখা প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত পাঠজগৎ যদি কেউ অনুসরণ করেন, তাহলে দেখবেন রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, নিৎসে, ফয়েরবাখ, হাইডেগার, কামু, কাফকা, বোর্হেস, ফুকো কিংবা দেল্যুজের মতো চিন্তকদের সঙ্গে আমার পরিচয় বহু পুরোনো।

এখানে মূল বিষয়টি হলো—রবীন্দ্রনাথ এখানে ব্যক্তি নন, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক।

শেষ দৃশ্যটি ইতিহাস নয়; বরং একটি স্বপ্ন ও প্রতীকের জগৎ। সেখানে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘শেষ নৈশভোজ’-এর মতো একটি প্রতীকী বিন্যাস তৈরি হয়েছে।

সেখানে রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্র, জীবনানন্দ ক্ষত, মহীন সময়—এভাবে একটি প্রতীকী কাঠামো গড়ে উঠেছে।

সুতরাং আমার কাছে ‘বনলতা সেন’ কোনো অভিযোগপত্র নয়। এটি বাংলা সাহিত্য ও সভ্যতার একটি আত্মপ্রতিকৃতি। সেখানে রবীন্দ্রনাথ কেন্দ্র, জীবনানন্দ ক্ষত, মহীন সময়, আর বাকিরা ইতিহাস। এবং সেই ইতিহাসের মাঝখানে শুয়ে আছে এক কবি, যাকে সবাই পড়ছে, সবাই ব্যাখ্যা করছে, কিন্তু খুব কম মানুষ তার ব্যথার কাছে পৌঁছাতে পারছে।

শিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; শিল্পের কাজ মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা। ‘বনলতা সেন’ সেই সংলাপেরই একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।

লেখক: নির্মাতা, বনলতা সেন

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
শিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা
সমালোচনার জবাবে আলাপশিল্পের কাজ মূর্তি নির্মাণ নয়; মূর্তির সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা
রোমান্টিক ছবিতে কি অচল ত্রিশোর্ধ্ব নায়িকারা? প্রশ্ন তাপসী পান্নুর
রোমান্টিক ছবিতে কি অচল ত্রিশোর্ধ্ব নায়িকারা? প্রশ্ন তাপসী পান্নুর
শিল্পী সমিতির নির্বাচন: বাপ্পারাজ সরে দাঁড়ানোয় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মুক্তি
শিল্পী সমিতির নির্বাচন: বাপ্পারাজ সরে দাঁড়ানোয় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মুক্তি
হইচইয়ে আসছে অপূর্ব–ইয়াশের ‘হেডলাইন’
হইচইয়ে আসছে অপূর্ব–ইয়াশের ‘হেডলাইন’
বাবাকে মানুষ নিজের ‘ফ্যামিলি’ ভাবে, সন্তান হিসেবে এটা দারুণ অনুভূতির: নুহাশ হুমায়ূন
বাবাকে মানুষ নিজের ‘ফ্যামিলি’ ভাবে, সন্তান হিসেবে এটা দারুণ অনুভূতির: নুহাশ হুমায়ূন