আইএসের নামে প্রচারিত সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে দেখা মেলে ‘ভারতীয় জিহাদি’দের। প্রচারিত হয় তাদের সাক্ষাৎকার। ভিডিওতে ওই ‘জিহাদি’দের শনাক্ত করার পর দিশেহারা তাদের স্বজনেরা। হঠাৎ প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শুনে কেউ কেউ আবেগাপ্লুত। কারও কারও বুকে আবার স্বজন হারানোর ক্ষত। কেউবা আবার ভীষণ ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন, সিরিয়া থেকে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে তাদের প্রিয়জন।
সিরিয়ায় আইএসে যোগ দেওয়া ভারতীয় জিহাদিদের কাছের মানুষদের অনুভূতি নিয়ে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। সেখানেই ধরা পড়েছে ‘ভারতীয় জিহাদি’দের আত্মীয়-স্বজনদের ওই অসহায়ত্ব।
ভারতে প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি দিয়ে সম্প্রতি আইএসের নামে প্রকাশিত তথ্যচিত্রটিতে ভারতীয় জিহাদির সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। শনিবার সেই তথ্যচিত্রের ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন হাজির করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। প্রতিবেদনে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ২০১৪ সালে আইএসে যোগ দিতে ইরাক ও সিরিয়ায় যাওয়া ৫ জিহাদিকে ওই তথ্যচিত্রে প্রতিশোধের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। তারা বলছেন, ভারতের গুজরাট, কাশ্মির, মুজাফফরনগরের মুসলমান হত্যা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিশোধ নেবেন।
আরও পড়ুন: মুসলমান হত্যা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বদলা নেবে আইএস!
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শনিবারের খবর অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় চলে যাওয়া ভারতীয় তরুণ ফাহাদ শেখ মহারাষ্ট্রের প্রকৌশলবিদ্যার শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ভিডিওতে তাকে আবু আমর আল-হিন্দি নামে দেখা গেছে। সেখানে শেখকে প্রতিজ্ঞা করতে দেখা গেছে। ভিডিওতে তিনি বলছেন, ‘আমরা আবার ফিরব, তবে হাতে তলোয়ার থাকবে। বদলা নেব কাশ্মির, গুজরাট, মুজাফফরনগরে মুসলিম হত্যার, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের।’
তথ্যচিত্রটির খবর প্রকাশের পর ফাহাদ শেখসহ আরও বেশ কয়েকজন জিহাদির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এর ভিত্তিতে প্রকাশিত রবিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাহাদ শেখের বোন নিদা ফাজিল তার ভাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করা ও কথা বলার জন উদগ্রীব হয়ে আছেন। ফাহাদ শেখ যে মামা হয়েছেন সে কথা তাকে জানাতে চান নিদা। ‘কিভাবে তারা এখন ফেরার কথা ভাবতে পারে? আপনারাই দেখুন না আরিবের কী অবস্থা হয়েছে।’ এভাবেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন নিদা।
উল্লেখ্য, আরিব মাজিদ হলেন ২০১৪ সালে কালিয়ান থেকে আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাওয়া চার ভারতীয় তরুণের একজন। ওই একই বছরের নভেম্বরে আবার ভারতে ফেরত আসেন তিনি। এখন ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ’র আওতায় বিচারাধীন আছেন আরিব।
আরও পড়ুন: আইএসের নামে নতুন বার্তা, রমজানে পশ্চিমা দেশগুলোতে হামলার আহ্বান
ফাহাদ শেখ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শিক্ষার্থী ছিলেন। ফাহাদের রয়েছে চার বোন ও একটি ভাই। পাইপিং ও এয়ার কন্ডিশানার ফিটিং নিয়ে একটি শর্ট কোর্স শেষ করার পর চাকরি খুঁজছিলেন ফাহাদ শেখ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র তারই পাসপোর্ট ছিল। ২০১৪ সালের মে মাসে আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় চলে যান ফাহাদ। তার বোন নিদা জানান, ফাহাদ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের বাবা চিকিৎসক তানভীর শেখ ছয় মাস তার ক্লিনিকে যেতে পারেননি। পরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন তানভীর। নিদা বলেন, ‘আমি ফাহাদকে আমার ৯ মাস বয়সী মেয়ের কথা বলতে চাই।’
ফাহাদের সঙ্গেই সিরিয়ায় যান আরও তিনজন। তারা হলেন- মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থী আমান ট্যান্ডেল, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আরিব মাজিদ এবং সাহিম তানকি। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন সাহিম। ফাহাদ আর আমান এখনও সিরিয়াতেই আছেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে আরিব মাজিদ দেশে ফেরেন। আর গত বছর এক বোমা হামলায় নিহত হন সাহিম। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ২৩ বছর।
ফাহাদ শেখের বাড়ি থেকে কাছাকাছি দূরত্বেই অবস্থিত আমান ট্যান্ডেলের বাড়ি। সে বাড়িতে কোনও টেলিভিশন নেই। আইএসের তথ্যচিত্রটি শুক্রবার প্রকাশিত হলেও সে খবরটি তারা জানতে পেরেছেন শনিবার দুপুরের পর। পরিচিত একজনের কাছ থেকেই জানতে পেরেছেন তারা। এখনও তারা তথ্যচিত্রটি না দেখলেও ছবি দেখে আমানকে শনাক্ত করেছেন। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ শিক্ষারত অবস্থায় সিরিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন আমান। তার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে বাবা নাইম ট্যান্ডেলের কণ্ঠস্বরে রাগের ছোঁয়া স্পষ্ট। ছেলেকে তার কর্মকাণ্ড থেকে ঠেকাতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি। তবে এ ব্যাপারে আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি নাইম। আমানদের পরিবারের ব্যাপারে জানাশোনা আছে এমন এক ব্যক্তি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন গত বছরের শেষ পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন আমান। পরিবারের সদস্যরা আমানকে দেশে ফিরে আসতে বলতেন। কিন্তু আরিব মাজিদের গ্রেফতারের খবর শোনার পর দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানান আমান।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর অনুযায়ী, গোবিন্দওয়াদির ফ্ল্যাট বিক্রি করাসহ ২০১৪ সালের মে মাস থেকে আমানের পরিবার দুইবার তাদের আবাস বদলেছে। তথ্যচিত্রটিতে আমানকে বোমা হামলায় নিহত সাহিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে। তবে সাহিমের মা এখনও বিশ্বাস করেন না যে ছেলে মারা গেছেন। অবশ্য, পরিবারের বাকি সদস্যরা ধীরে ধীরে সাহিমের মৃত্যুর খবরকে মেনে নিতে সক্ষম হয়েছেন। সাহিমের এক চাচা নাম প্রকাশ না করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, তাদের পরিবার এখন পর্যন্ত সাহিমের জানাজা করেনি। কেননা তার মা এখনও মৃত্যুর খবরটি মেনে নিতে পারেন না। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এবিপি আনন্দ
/এফইউ/বিএ/








