যুদ্ধে প্রাণহানি অনিবার্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধরন পাল্টালেও প্রাণহানি বন্ধ হয়নি। এক সময় যুদ্ধ ছিলো সেনাদের বিরুদ্ধে সেনার লড়াই। সাধারণ মানুষদের যুদ্ধে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকতো কম। কিন্তু এখন যুদ্ধ মানে শুধু দু’পক্ষের সেনাদের লড়াই নয়। যুদ্ধরত দু’পক্ষের সংঘাতে প্রাণ হারাতে হয় সাধারণ মানুষকে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানে সরকারিবাহিনী ও তালেবানদের মধ্যকার যুদ্ধে প্রাণ হারাতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে। এ যেন যুদ্ধরত দু’পক্ষের ‘ক্রসফায়ার’-এ বেসামরিক আফগানরা।
২০১০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ৩০ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আফগানিস্তানে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণেরও সিদ্ধান্ত নেয়। এ সুযোগে ২০১৫ সালে শক্তি সঞ্চয় করে আফগান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে তালেবানরা। সম্প্রতি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত তালেবান নেতা মোল্লা মনসুরের নেতৃত্বে তালেবানরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আফগান সরকারও শুরু করে পাল্টা আঘাত। তালেবান ও সরকারের অস্তিত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ে প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাতে হচ্ছে বেসামরিক ও সাধারণ আফগান নাগরিকদের।
সিতাইশ ও সানা যথাক্রমে তিন বছর ও এক বছর বয়সী মেয়ে। মা বাসিরা মোহাম্মদির কাছে তারা বার বার জানতে চায় তাদের বাবার কথা। কিন্তু মা তাদের কোনও জবাব দিতে পারেন না। পারবেন কী করে? চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার স্বামী মোহাম্মদ আলি মোহাম্মদি তালেবানদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। বাসিরা বলেন, ‘আমি ওদের প্রশ্ন শুনতে শুনতে এখন খুব ক্লান্ত। ওদের বুঝিয়ে বলতেও পারি না যে, আলি মারা গেছেন, আর কোনওদিনই ফিরে আসবেন না।’
আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা টোলো নিউজের একটি প্রতিষ্ঠানে ডাবিং আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করতেন আলি। কাবুলে তালেবানদের এক আত্মঘাতী হামলায় আরও ছয় সহকর্মীর সঙ্গে প্রাণ হারান তিনিও।
বাসিরা বলেন, ‘আলি রোজ কাজ শেষ করে ফেরার সময় আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন কিছু কিনে আনতে হবে কি-না। সেই রাতে আমার ফোন আর বাজেনি। পরদিন সকালে শ্বশুরের কাছ থেকে জানতে পারলাম আলি আর বেঁচে নেই।’
তালেবানরা ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোল্লা মনসুরের নেতৃত্বে আফগান বাহিনীকে হটিয়ে দেশের বেশ কিছু অঞ্চলের দখল নেয়। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্রতি মাসে ৮০০ থেকে ১০০০ হামলা চালিয়েছে তালেবানরা। ওই বছরই শেষের দিকে টোলো নিউজকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয় তালেবানরা। অক্টোবরে কুন্দুসে তালেবান যোদ্ধাদের হত্যা, অপহরণ ও ধর্ষণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের খবর প্রকাশ করেছিল টোলো নিউজ। তালেবানরা দাবি করে, ওই প্রতিবেদনগুলোতে দেওয়া তথ্য সঠিক নয়। জানুয়ারি মাসে ওই আত্মঘাতী হামলার পর আল-জাজিরাকে একটি বিবৃতি ই-মেইল করে তালেবানরা। সেই বিবৃতিতে ওই হামলার দায় স্বীকার করে তালেবানরা।
আরও পড়ুন: ইউক্রেনের একটি বৃদ্ধাশ্রমে আগুন, নিহত অন্তত ১৭
বাসিরা বলেন, ‘আমি যখন মোল্লা মনসুরের মৃত্যুর খবর পাই, আমি খুশি হইনি, কষ্টও পাইনি। আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছি। কিন্তু মোল্লা মনসুরকে ঘৃণা করলে তো আমার স্বামী ফিরে আসবেন না।’
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিমান হামলায় প্রাণ হারান মোল্লা মনসুর। এর পর পরই মোল্লা হায়বাতুল্লাহ আখন্দজাদাকে তালেবানদের নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাসিরা বলেন, ‘তালেবানদের নেতা কে হন তাতে কিছু আসে যায় না। এ দেশে প্রতিদিন নিরাপরাধ মানুষ মরছে। নতুন নেতা এসে তো কোনও কিছু পরিবর্তিত হবে না। তারা যুদ্ধ করতেই থাকবে।’
তিনি তালেবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা সাধারণ মানুষ হত্যা করবেন না। দয়া করুন, আমাদের মারবেন না।’
গত মাসে কাবুলে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের গাড়ি চালক সাইফুল্লাহ। তার রয়েছে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তানটির বয়স মাত্র দুই বছর।
সাইফুল্লাহর বাবা হাজি হাশমতুল্লাহ বলেন, ‘এই ক্ষতি সহ্য করার উপায় আমার জানা নেই। আমার ছেলের কোনও দোষ ছিল না। আমি এই হত্যাকাণ্ডের দায় আফগান সরকার ও তালেবানদের ওপর দিতে চাই। এরা দুপক্ষ সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে কেবল যুদ্ধ করেই যাচ্ছে।’
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আফগানিস্তানে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত সাড়ে তিন হাজার সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। নিহত প্রতি চারজনের একজনই শিশু।
আরও পড়ুন: ইরাক যুদ্ধ: চিলকট তদন্তের রায় প্রত্যাখ্যান করবেন টনি ব্লেয়ার
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি দলের মহাসচিব নিকোলাস হায়সোম বলেন, ‘এই প্রতিবেদনের তথ্য থেকে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার কেবলই বাড়ছে। এমন নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা কোনওমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৫ সালে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার বেড়েছে শতকরা ৪ শতাংশ।
এদিকে, তালেবান সূত্র আল-জাজিরাকে জানায়, শান্তি আলোচনার কোনও সম্ভাবনাই নেই। মোল্লা মনসুর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। এখন মোল্লা মনসুর হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
একদিকে সরকারিবাহিনী, আরেক দিকে তালেবানরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে কত মানুষের জীবন, অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে সিতাইশ ও সানার মতো লাখো শিশুর ভবিষ্যত। অথচ এ যুদ্ধ বন্ধের কোনও সম্ভাবনাও দৃশ্যমান নয়। এ হতাশা আর উৎকণ্ঠাই ঝরে পড়লো সিতাইশ ও সানার মায়ের কণ্ঠে। উদ্বিগ্ন মা বাসিরা বলেন, ‘আমাদের সরকার তালেবানদের বিরুদ্ধে ব্যর্থ, তালেবানরাও কিছুতেই থামছে না। আসলে কোথায় যাচ্ছি আমরা?’ আল-জাজিরা।
/ইউআর/এএ/








