উচ্চ বাড়ি ভাড়া ও চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজারে সীমিত বেতনে কুলিয়ে উঠতে হাঁপিয়ে উঠছেন ব্রিটিশ তরুণরা। এমতাবস্থায় ক্যারিয়ার গড়তে তরুণদের মধ্যে দেশ ছাড়ার হিড়িক বেড়েছে।
ব্রিটিশ জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের (ওএনএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন পর্যন্ত বিগত এক বছরে ৩৫ বছরের কম বয়সি এক লাখ ৯৫ হাজার মানুষ অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছেন।
তরুণদের পছন্দনীয় গন্তব্য, তাদের জীবনধারা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই বিবিসি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
টোকিওতে নিরাপদ বোধ করেন রেই আমজাদ
কয়েক বছর আগে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন রেই আমজাদ। প্রাথমিকভাবে ঐতিহাসিক শহরটিতে থেকে যাওয়ার কথা ভাবলেও দ্রুতই তার মত বদলে যায়।
ম্যানচেস্টারের ২৫ বছর বয়সি রেই ওয়েব ডিজাইনে রিমোট কাজ করতে করতে ২০টি দেশে ভ্রমণ করেন এবং বুঝতে পারেন, তিনি আর যুক্তরাজ্যে ফিরতে চান না।
তিনি গত বছর শীর্ষ স্নাতকদের জন্য দুই বছরের ভিসায় টোকিওতে যান এবং ভবিষ্যতে সেখানে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার আশা করছেন।
তিনি বলেন, এখানে নিজেকে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়। ফোন ছিনতাইয়ের ভয় ছাড়াই হাঁটতে পারি। ক্যাফেতে ল্যাপটপ রেখে গেলেও তা নিরাপদ থাকে।
রেই জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয়বন্ধুরা অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ে চলে গেছেন। ব্রিটেন ছাড়ার পেছনে জীবিকা নির্বাহের ব্যয় ও চাকরির সুযোগের অভাবকে তারা প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাজ্য অনেক মেধাবী তরুণকে হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন রেই। তিনি বলেন, এদিকে, জাপান আমাদের পেয়ে উপকৃত হচ্ছে। আমরা পুরোপুরি পরিপক্ক অবস্থায় এখানে আসছি, আমাদের শিক্ষা বা শৈশবের স্বাস্থ্যসেবায় তাদের কিছুই খরচ করতে হয়নি।
তিনি বলেন, টোকিওতে আগে মূলত একটু বেশি বয়সি লোকজনই কাজের জন্য আসত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেটা বদলেছে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষার টানে দুবাই
ইসোবেল পার্ল পাঁচ বছর আগে ওয়াটফোর্ডে বাবা-মায়ের বাড়ি থেকেই নিজের স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড শুরু করেন। এখন ৩০ বছর বয়সি ইসোবেল নতুন বছরে দুবাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ব্যবসা সম্প্রসারণের আশা করছেন।
তিনি বলেন, আমার বোন কয়েক বছর আগে দুবাই গেছে, বাবা-মাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তাই এটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
তার মতে, দুবাইয়ে যাওয়া অধিকাংশ মানুষের বড় লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে। এই শক্তিটা খুব জরুরি। এখানে সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক কমিউনিটি আছে, জায়গাটি খুব অনুপ্রেরণাদায়ক।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ইউএই ১০ হাজার ‘গোল্ডেন ভিসা’ ছেড়েছিল, যা ১০ বছর সেখানে বসবাসের সুযোগ দেয়। প্রথম দফায় ওই ভিসাপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন ইসোবেল।
তিনি বলেন, স্কিনকেয়ার পণ্য যুক্তরাজ্যেই তৈরি হবে, তবে দুবাই থেকে পরিচালনা করবেন এবং ভবিষ্যতে ইউএইতে আমদানি ও বিক্রির আশা করছেন।
নতুন দেশে বন্ধু, ঘোড়া আর গ্রামাঞ্চলের বেড়ানো মিস করবেন বলেও কিছুটা আক্ষেপ করেন পার্ল। তবে, দুদেশের দূরত্ব কেবল সাত ঘণ্টার ফ্লাইটের- এ বলে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
‘করপোরেট চাকরি আমাকে বিষণ্ন করে তুলছিল’
নিজের অনলাইন ব্যবসা লাভের মুখ দেখতেই প্লেনে চেপে বসেন সল হাইড। ২৫ বছর বয়সি সল গত অক্টোবরে করপোরেট চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে যেন এক অন্ধকার শীতল জগতে নিজেকে আবিষ্কার করতাম। বন্ধুরা সবাই অতিরিক্ত কাজ করত। জীবনটা ক্রমে নিঃসঙ্গ হয়ে উঠছিল।
জানুয়ারিতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসা বাড়াতে সহায়তাকারী মার্কেটিং কনসালটেন্সি শুরু করেন।
চলতি বছরে তিনি বেশিরভাগ সময় বালিতে কাটিয়েছেন, তবে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে থাকতে পারেন বলে মনে করেন।
করপোরেট চাকরির বিষণ্নতা ঝেড়ে ফেলেছেন সল। তিনি বলেন, আমি ঘুম থেকে উঠে মিষ্টি রোদ উপভোগ করি, মোটরবাইকে করে রান ক্লাবে (দৌড়বিদদের সংগঠন) যাই, ৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে কফি খাই, বন্ধুদের সঙ্গে কাজ করি, আবার সন্ধ্যায় বের হই।
তবে পরিবার ও পুরনো বন্ধুদের ছেড়ে আসাটা সবচেয়ে কঠিন ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে, দূরে থেকেও প্রিয়জনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সল। তিনি জানান, করপোরেট চাকরির সময় কাজের চাপে তাদের দেখাই পেতাম না। এখন আমরা বরং বেশি কথা বলি।
বর্তমানে তার ছয়জন কর্মী আছে, আরও চারজন নিয়োগ দেবেন। তবে তার বিশ্বাস, যুক্তরাজ্যের করব্যবস্থা তার ঝুঁকি নেওয়া ও ব্যবসা বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করত।
যুক্তরাজ্যে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা (প্রবাসজীবন) আমার জন্য মধ্যমেয়াদি সমাধান। আমি যুক্তরাজ্যকে ভালোবাসি এবং ভবিষ্যতে ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না। তবে এখন চলে আসায় আমি খুশি।
বিশেষজ্ঞ মতামত
ইভেলিন পার্টনার্সের আর্থিক পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ডেভিড লিটলের মতে, উচ্চ বেকারত্ব, বাড়তে থাকা ঋণ ও করের চাপ এবং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার কারণে তরুণরা বিদেশমুখী হচ্ছেন।
তার মতে, বেতনে করছাড়, কম অপরাধপ্রবণতা এবং শক্তিশালী চাকরির বাজারের কারণে ব্রিটিশদের জন্য দুবাই বৈশ্বিক ক্যারিয়ার হাবে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ইউএইয়ের মতো গন্তব্যগুলো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ দেয়—যা অনেক বেশি আশাবাদী ও লাভজনক।
ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনসের এক মুখপাত্র বলেন, বাজেটে করপোরেশন ট্যাক্স ২৫ শতাংশে স্থির রেখে, হাই স্ট্রিটে স্থায়ী কম করহার দিয়ে এবং স্টার্টআপ সহজ করে অর্থনীতি ও চাকরি সৃষ্টিতে জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রত্যেক তরুণের সফল হওয়ার ন্যায্য সুযোগ থাকা উচিত। ৮৭ শতাংশ কর্মসংস্থান হারের সঙ্গে স্নাতকেরা এখনও ডিগ্রিবিহীনদের তুলনায় বেশি কর্মরত।
সূত্র: বিবিসি








