বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূসের সরকারের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনূসের শাসনামলকে ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা তাদের সরেজমিন প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
ঢাকার অটোরিকশাচালক রুবেল চাকলাদার বলেন, “আমরা একটা বড় পরিবর্তনের সুযোগ হারিয়েছি। আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকভাবে কাজ করতে দিইনি। জুলাইয়ে মানুষ জীবন দিয়েছে, কিন্তু তার কোনও ফল পেলো না।” তার এই বক্তব্যে অনেকের হতাশার প্রতিফলন থাকলেও, অন্যদের মতে ইউনূস রাষ্ট্র ভেঙে পড়া ঠেকাতে পেরেছিলেন, যদিও গভীর কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যেই দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। সহিংসতায় ১৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। একই সঙ্গে তিনি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরির জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের অঙ্গীকার করেন।
তাঁর নিয়োগের পক্ষে থাকা ছাত্রনেতারা জানান, অস্থির সেই সময়ে ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৈশ্বিক অংশীদারদের আশ্বস্ত করেছিল। ২০২৪ সালের শিক্ষার্থী জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম পোস্টারবয় এবং বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, “সেই মুহূর্তে আমাদের এমন একজন দরকার ছিল, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ইউনূস ছাড়া এমন কাউকে আমরা পাইনি।”
সমর্থকদের দাবি, ইউনূসের আমলে নির্বাচন, সংবিধান, বিচারব্যবস্থা এবং হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একাধিক সংস্কার ও তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। গুম সংক্রান্ত তদন্তে দেড় হাজারের বেশি যাচাই করা ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি রাষ্ট্র কর্তৃক দীর্ঘদিন অস্বীকার করে আসা গোপন আটককেন্দ্রের অস্তিত্বও প্রকাশ্যে আসে।
বিশ্লেষক মুবাশশার হাসান বলেন, “বাংলাদেশ যখন ভেঙে পড়ার মুখে ছিল, তখন তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।” তবে তাঁর মতে, পূর্ববর্তী সকল অন্যায়ের বিচারের জন্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি আরও বিস্তৃত হতে পারতো। অন্য বিশ্লেষকদের মতে, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং অনির্বাচিত সরকারের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে ইউনূস দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে পারেননি।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বিভক্ত। বিএনপি ইউনূসের নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা ফেরানো ও নির্বাচন আয়োজনের কৃতিত্ব স্বীকার করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে ব্যাপক সংস্কারের বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থি দলগুলোর মতে, প্রক্রিয়াটি অসম্পূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় ছিল।
ঢাকার থমকে থাকা যানজটে অটোরিকশাচালক রুবেল চাকলাদার জানান এক পারিবারিক বাস্তবতার কথা। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে এখনও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক, আর তাদের মত বদলাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই বাস্তবতাই, তাঁর ভাষায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তাঁর আশাহীনতার মূল কারণ।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আমি ভোট দেবো। পরিবর্তনের আশায় নয়, বরং করার মতো আর কিছু নেই বলেই। আমার জীবন বা দেশের ভাগ্য এই নির্বাচন অর্থপূর্ণভাবে বদলে দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।









