কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যেভাবে বিশ্বজুড়ে তথ্য সংগ্রহের ধরন বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাদের মতে, এআই মূলত নির্দিষ্ট কিছু গৎবাঁধা ধারণা টিকিয়ে রাখছে এবং আদিবাসী ও কৃষ্ণাঙ্গ বা বর্ণিল মানুষের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও সূক্ষ্মতাগুলোকে মুছে দিচ্ছে। অধিকাংশ মূলধারার এআই মডেলগুলো মূলত পশ্চিমা লেখক, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের কাজের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ও প্রশিক্ষিত। ফলে এআই নিয়মিতভাবে তাদের মূল্যবোধ, লেখার শৈলী, দৃষ্টিভঙ্গি ও পক্ষপাতকেই অনুকরণ করে চলেছে।
সমালোচকদের মতে, এই অবাধ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া আসলে উপনিবেশবাদেরই এক নতুন রূপ। যেখানে সাম্রাজ্যবাদী যুগের ভূখণ্ড দখলের জায়গা নিয়েছে তথ্য চুরি, আর কোনও বিজয়ী রাষ্ট্রের বদলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই তথ্য থেকে মুনাফা লুটছে এআই কোম্পানিগুলো। প্রায়শই এই গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে কোনও অনুমতি বা তথ্যের সত্যতা যাচাই ছাড়াই ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মানবিক শ্রম ও ডেটা উৎপাদনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণারত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলিয়ান পোসাদা বলেন, উপনিবেশবাদকে সব সময় এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখানো হয় যা অতীতে ঘটে গেছে। অনেক দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে এবং পাঠ্যবই বলছে ‘উপনিবেশবাদ শেষ’। তবে আধুনিককালের উপনিবেশবাদ এখনও টিকে আছে, যা মানুষ প্রায়শই চিনতে পারে না।
মূলত অধিকাংশ লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরি হয়েছে পশ্চিমা, শিক্ষিত, শিল্পোন্নত, ধনী ও গণতান্ত্রিক সমাজে। এগুলো ডেটা সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, সংবাদ আর্কাইভ এবং ডিজিটাইজড উপাদান থেকে, যার বেশির ভাগেরই উৎপত্তি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে। ফলে এই প্রশিক্ষণ উপকরণের কারণে এআই মডেলগুলো পশ্চিমা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা মূল্যবোধের ভুল বিবরণ তৈরি করছে। প্রযুক্তি জায়ান্টরা আরও বৈচিত্র্যময় ডেটা যুক্ত করার চেষ্টা করলেও এই ভুলগুলো থেকেই যাচ্ছে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিত্য বশিষ্ঠ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এআই মডেলগুলো প্রায়শই সব ভারতীয় খাবারকে সমৃদ্ধ, সুগন্ধযুক্ত ও মশলাদার বলে থাকে, যা আসলে সত্যি নয়। এতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা ঢাকা পড়ে যায়। তিনি বলেন, আপনি বিভিন্ন আঞ্চলিক রন্ধনশৈলী পাবেন যা ব্যবহৃত মশলার ধরন বা পরিমাণের দিক থেকে একে অপরের চেয়ে আলাদা।
‘ডেটা গ্র্যাব: দ্য নিউ কলোনিয়ালিজম অব বিগ টেক অ্যান্ড হাউ টু ফাইট ব্যাক’ বইয়ের সহ-লেখক নিক কুড্রি বলছেন, ডেটা নিয়ে নেওয়াটাই একটি গভীর উপনিবেশবাদী আচরণ। তিনি বলেন, এটি তো ইন্টারনেটে খোলাই আছে, আমরা স্রেফ নিয়ে নিতে পারি, এমন বলাটাই ছিল উপনিবেশবাদের মূল কথা, সবকিছু স্রেফ কেড়ে নেওয়া। শুধু আমরা নিতে পারি তা-ই নয়, আমাদের নেওয়া উচিত এবং আমাদের অধিকার আছে এটা নিয়ে যা খুশি তা-ই তৈরি করার এবং তা থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা বের করার।
কুইন্স ইউনিভার্সিটির ফেলো এবং পিকোয়াকানাগান ফার্স্ট নেশনের সদস্য মাইকেল শেরবার্ট জানান, বিগ টেকের দ্রুত এগিয়ে যাওয়া এবং মুনাফা করার তাড়না এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক আমেরিকান এআই কোম্পানি চীনা কোম্পানিগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাই না? আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের জ্ঞান ও সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা বেশ ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যা তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।
কামা ডট এআই-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ওন্টারিওর চ্যাপলিউ ক্রি ফার্স্ট নেশনের সদস্য ব্রায়ান রিচি বলেন, তিনি আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে অনেক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে এআই প্রশিক্ষণে আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করার কোনও নজির তিনি দেখেননি।
উল্লেখ্য, অনেক আদিবাসী ঐতিহ্য এআই-এর আওতায় আসছে না, কারণ সেগুলো লিখিত শব্দের চেয়ে মুখে মুখে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়ায়, যা এলএলএম-এর পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া কিছু জ্ঞান তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই গোপন রাখে বলে জানান শেরবার্ট।
শেরবার্ট বলেন, সমস্যাটা কেবল ভুল তথ্যের নয়। এই সিস্টেমগুলো এবং এলএলএম-এর দেওয়া উত্তরগুলো দিন দিন মানুষের নিজেদের সম্পর্কে, সংস্কৃতি, ইতিহাস, পরিচয় এবং এমনকি কোনটি সত্য ও বৈধ, তা বোঝার ধরণকে বদলে দিচ্ছে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস









