বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কোথায়? 

গোলাম মওলা
০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১২:১৪

আর মাত্র কয়েক দিন পর জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বাজেট নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাজেটের আকার কত হবে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কত ধরা হবে, ঘাটতি কত, কত ঋণ নিতে হবে, কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়বে—এসব প্রশ্ন নিয়েই মূলত আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে।

কিন্তু দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মনে অন্য একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—‘এই বাজেটের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোথায়?’ প্রশ্নটি যত সহজ, উত্তরটিও তত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বাজেটকে অনেকেই সরকারের আয়-ব্যয়ের একটি হিসাবনিকাশ মনে করেন। বাস্তবে বাজেট শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনও আর্থিক দলিল নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক অগ্রাধিকারের বার্ষিক রূপরেখা। আরও সহজভাবে বললে, বাজেট হলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলার সবচেয়ে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত।

সংসদে বাজেট পাস হওয়ার কয়েক মাস পর একজন গৃহিণী যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল কিংবা মাছের দাম দেন, একজন চাকরিজীবী যখন বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন, একজন কৃষক যখন সার কেনেন, একজন তরুণ চাকরির জন্য আবেদন করেন, কিংবা একজন রোগী চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খান—তখন তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাজেটের প্রভাবই অনুভব করেন। অর্থাৎ বাজেটের প্রকৃত বিচার হয় না সংসদের করতালিতে; হয় মানুষের রান্নাঘরে, বাজারের ঝুড়িতে এবং সংসারের হিসাবের খাতায়।

বাজেট আসলে জনগণের সংসারের খাতা

একটি পরিবার যেমন বছরে কত আয় হবে এবং কোথায় কত খরচ করা হবে তার পরিকল্পনা করে, রাষ্ট্রও ঠিক তেমনই একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করে। পার্থক্য শুধু সংখ্যায়। একটি পরিবার কয়েক লাখ টাকার হিসাব করে, আর রাষ্ট্র হিসাব করে লাখ কোটি টাকার। কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক যুক্তি একই। আয় কম হলে খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। খরচ বেশি হলে ঋণ নিতে হয়। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হয়। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হয়। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। অথচ সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি ঘাটতি থাকবে, যা পূরণ করতে হবে দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে। এই ঋণ আজ সরকার নিলেও ভবিষ্যতে তা পরিশোধ করতে হবে জনগণের অর্থ দিয়েই। সুতরাং, বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নাগরিকের জীবনেই ফিরে আসে।

বাজারের ঝুড়িতেই বাজেটের প্রথম পরীক্ষা

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বর্তমানে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো মূল্যস্ফীতি। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে অনেক পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। মাছ-মাংসের পরিবর্তে অনেকেই কম ব্যয়বহুল খাদ্যের দিকে ঝুঁকেছেন। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমেছে, নিম্নবিত্তের জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— বাজারে কি স্বস্তি ফিরবে?

সরকার যদি আমদানি শুল্ক কমায়, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটায়, কৃষি উৎপাদনে সহায়তা বাড়ায় এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা নেয়, তাহলে পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য যদি নতুন ভ্যাট বা শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে তার প্রভাবও সরাসরি বাজারে গিয়ে পড়বে। তাই বাজারই হচ্ছে বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার।

আয়কর না দিলেও সবাই করদাতা

বাংলাদেশে আয়করদাতার সংখ্যা এখনও সীমিত। ফলে অনেকেই মনে করেন বাজেটের করনীতি তাদের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মোবাইল ফোনে কথা বললে কর দিতে হয়। ইন্টারনেট ব্যবহার করলে কর দিতে হয়। সাবান, শ্যাম্পু, পোশাক, রেস্টুরেন্টের খাবার, পরিবহন সেবা কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহার্য বহু পণ্য কিনলেও কর দিতে হয়। অর্থাৎ একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে একজন শিল্পপতি— সবাই কোনও না কোনোভাবে কর দেন।

এ কারণেই ভ্যাটকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘নীরব কর’ বলে অভিহিত করেন। বাজেটে ভ্যাট ও শুল্কের সামান্য পরিবর্তনও লাখ লাখ মানুষের ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

মূল্যস্ফীতি বনাম রাজস্ব: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় নীতিগত দ্বন্দ্ব হলো রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে সরকারের অর্থ প্রয়োজন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বিপুল রাজস্ব দরকার। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় কর বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহের চেষ্টা করলে তা আবারও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। সুতরাং, আগামী বাজেটের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকার কীভাবে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে তার ওপর।

চাকরির সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক

প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই হারে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। তাই একজন বেকার তরুণের কাছে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—চাকরি হবে কি? বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, শিল্পায়নের সুযোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, প্রযুক্তি খাতে প্রণোদনা এবং রফতানি খাতের সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে ব্যবসার খরচ বাড়লে বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়। অর্থাৎ বাজেটের পাতায় লেখা করনীতি ও বিনিয়োগ নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ।

কৃষকের বাজেট, ভোক্তার বাজেট

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি এখনও কৃষি। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে। আবার কৃষক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে উৎপাদনে আগ্রহ হারান। তাই কৃষি ভর্তুকি, সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ, বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা শুধু কৃষকের বিষয় নয়; এটি শহরের ভোক্তারও বিষয়। কৃষকের লাভ মানে খাদ্য উৎপাদনের স্থিতিশীলতা। আর স্থিতিশীল উৎপাদন মানে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। সুতরাং, কৃষকের বাজেট এবং ভোক্তার বাজেট একই সুতোয় বাঁধা।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বাজেট কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে এখনও চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। একটি বড় অসুস্থতা অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। একইভাবে শিক্ষার ব্যয়ও ক্রমাগত বাড়ছে। তাই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কেবল প্রশাসনিক ব্যয় নয়; এটি মানুষের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

একটি সুস্থ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনও দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে এগোতে পারে না। এই কারণেই স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বাজেটকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের মূলধন হিসেবে দেখা উচিত।

মধ্যবিত্তের নীরব সংকট

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা সরকারি সহায়তা পায় না। আবার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত সম্পদও নেই। বাড়িভাড়া, শিক্ষাব্যয়, চিকিৎসা ব্যয়, পরিবহন ব্যয়—সবকিছু বেড়েছে। কিন্তু আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে চলছে। কেউ কেউ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আগামী বাজেট যদি মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।

শেষ কথা

বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব জানা প্রয়োজন নেই। একজন গৃহিণীর বাজারের হিসাব, একজন শ্রমিকের মজুরি, একজন কৃষকের উৎপাদন খরচ, একজন তরুণের চাকরির স্বপ্ন, একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় এবং একজন অভিভাবকের সন্তানের শিক্ষার খরচ—এসবের মধ্যেই বাজেটের প্রকৃত অর্থ লুকিয়ে আছে। রাষ্ট্রের বাজেট আসলে জনগণের জীবনযাত্রার আয়না। এই আয়নায় যদি মানুষের স্বস্তি, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য সুযোগ এবং ভবিষ্যতের আশা প্রতিফলিত হয়, তবেই বাজেট সফল বলা যাবে।

আগামী ১১ জুন সংসদে যে বাজেট উপস্থাপিত হবে তার আকার কত লাখ কোটি টাকা হলো, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি মানুষের জীবনকে কিছুটা সহজ করবে, নাকি আরও কঠিন করে তুলবে? কারণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না বাজেট বক্তৃতার করতালিতে; হয় বাজারে, রান্নাঘরে, কর্মস্থলে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৪১২৩২ হাজি
হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৪১২৩২ হাজি
ইরানে পাল্টা হামলা না করতে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের নির্দেশ
ইরানে পাল্টা হামলা না করতে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের নির্দেশ
আদ্-দ্বীন ক্ষতিপূরণ দিলেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না সরকার
আদ্-দ্বীন ক্ষতিপূরণ দিলেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না সরকার
আদ্-দ্বীনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আদ্-দ্বীনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক