দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। শুক্রবার (১২ জুন) ওয়াশিংটন ও তেহরান— উভয় পক্ষই এই বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, দুই পক্ষই চুক্তির খসড়ায় সম্মত হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি প্রাথমিক চুক্তি সই হতে পারে। খবর রয়টার্স।
তবে এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এটিকে নিজেদের বড় কূটনৈতিক ও সামরিক বিজয় হিসেবে দাবি করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, “খসড়ায় এখনও কিছু পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও এই চুক্তি প্রমাণ করে যে ইরান যুদ্ধ থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”
কী থাকছে এই চুক্তিতে?
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্র এবং খসড়া প্রস্তাবের বিবরণ অনুযায়ী, চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং অবরুদ্ধ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা শত কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড় দেওয়া শুরু হবে এবং ইরানের তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া এই কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ওমানের পাশাপাশি ইরানের হাতেই থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন আরাঘচি। তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালির ওপর আমাদের তলোয়ার সর্বদা ঝুলন্ত থাকবে।”
এর মাঝেই শনিবার হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ইরানের সিরিক বন্দর ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) অনুমতি ছাড়া পারাপারের চেষ্টাকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করতে ইরানি বাহিনী এই গুলি চালিয়েছে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জটিলতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পরমাণু কর্মসূচিকে অজুহাত করে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই মূল পরমাণু বিষয়টি চুক্তির পরবর্তী ধাপের জন্য তুলে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্বে এটি নিয়ে কথা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই চুক্তির চূড়ান্ত পরিণতিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা হবে। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ইরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করবে না, বড়জোর তা তরল বা মিশ্রিত করে নিজেদের কাছে রেখে দেবে।”
এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও খসড়ায় রয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও মার্কিন প্রশাসন ক্ষতিপূরণের দাবি অস্বীকার করে একে ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ইসরায়েল এই চুক্তির অংশ নয়
পশ্চিমা সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী রবিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সশরীরে বা দূরবর্তী মাধ্যমে এই চুক্তিতে সই করতে পারেন।
তবে আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করা ইসরায়েল এই শান্তি আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বাইরে রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “তার দেশ এই চুক্তির অংশ হবে না।”
ওয়াশিংটন যাতে তেহরানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে, সেজন্য লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করার মার্কিন দাবির পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, এই চুক্তির ফলে লেবানন যুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং ইসরায়েলি বাহিনী অধিকৃত অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হবে। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে ধস
পারস্য উপসাগরে গত এক সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘাত, মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা এবং ইসরায়েল-ইরান ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের পর এই শান্তি চুক্তির খবর এলো। এই সুসংবাদে বিশ্ব শেয়ার বাজারে চাঞ্চল্য দেখা দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস নেমেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৩ শতাংশেরও বেশি কমে গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বাজারে তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার কারণে এই যুদ্ধ হোয়াইট হাউসের জন্য একটি রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে থাকা রিপাবলিকানরা এই যুদ্ধ থেকে বের হতে চাচ্ছিলেন, যদিও দলের অনেক কট্টরপন্থী নেতা ইরানের জন্য এতটা সুবিধাজনক চুক্তি মেনে নিতে নারাজ।








