সিরিয়ার পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফার শান্তি অলোচনা পুনরায় শুরু হচ্ছে। বুধবার জেনেভায় নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে আলেপ্পো প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে সহিংসতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় দুর্বল অস্ত্রবিরতি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এ শান্তি আলোচনার লক্ষ্য হচ্ছে একটি অন্তবর্তী সরকার গঠন করে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটানো। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংঘাতে প্রায় তিন লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গৃহহীন হয়ে পড়েছেন দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ।
প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ভাগ্যের ব্যাপারে এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যেই জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক দূত স্ট্যাফান ডি মিসতুরা আসাদের প্রধান মিত্র দেশ ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। বুধবার প্রধান বিরোধী হাই নেগোসিয়েশন কমিটির সাথে আলোচনায় বসার প্রাক্কালে তারা এ বৈঠক করেন। এ সপ্তাহের শেষে প্রেসিডেন্ট আসাদের সমর্থিত গোষ্ঠীর প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে সহিংসতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় গত ফ্রেব্রুয়ারিতে করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বিরতি চুক্তি হুমকির মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন: ২৭ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে অভ্যর্থনা জানানোয় তুরস্ককে সম্মাননা
এর আগে গত ৩১ মার্চ যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার শরণার্থী নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে কানাডা। এদিন জার্মানি সফররত কানাডার অভিবাসন মন্ত্রী জন ম্যাককালাম তার দেশের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
বার্লিনে সিবিসি নিউজকে তিনি টেলিফোনে বলেন, “শরণার্থীদের পৃষ্ঠপোষকতার অংশ হিসেবে আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব আমরা তাদের সাদরে গ্রহণ করবো।”
আরও পড়ুন: সৌদি সেনা তুরস্কে: সিরিয়া নিয়ে উত্তেজনা
গত কয়েক মাসে দেশটি ২৫ হাজারেরও বেশি সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে কানাডা। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, কানাডার অধিবাসীদের মধ্যে সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণ করার ব্যাপারে বিভক্তি রয়েছে।
অভিবাসন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ২৮ মার্চ পর্যন্ত কানাডায় মোট ২৬ হাজার ২০০ সিরীয় শরণার্থী এসে পৌঁছেছেন। আরও ১৬ হাজারেরও বেশি আবেদন প্রক্রিয়াধীন কিংবা চূড়ান্ত হয়েছে। এসব আবেদনের মধ্যে এমন কী যেসব শরণার্থী এখনো এসে পৌঁছাননি তারাও রয়েছেন। এর আগে ম্যাককালাম বলেছিলেন, কানাডার ১০টি রাজ্যই শরণার্থী গ্রহণ করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
আরও পড়ুন: সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণ করুন: তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন উদারপন্থী দল কানাডা’র সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে। পূর্বসূরী প্রধানমন্ত্রী রক্ষণশীল দলীয় স্টিফেন হারপারের শরণার্থী নীতির বিপরীত অবস্থানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন জাস্টিন ট্রুডো। হারপার কানাডায় শরণার্থী গ্রহণে অনাগ্রহী ছিলেন।
অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দেন দুনিয়ার নানা প্রান্তের বিপুল সংখ্যক মানুষ। এদের অধিকাংশই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিক। ছয় বছরের গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটির অনেক নাগরিক জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়াকেই আপাত সমাধান হিসেবে ধরে নিয়েছেন। তবে নানা কারণে নিজ দেশ ছাড়লেও ইউরোপের দেশগুলোতে তারা মিশ্র পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেকে শরণার্থীদের বরণ করে নিলেও মুসলিমবিদ্বেষী অবস্থান থেকে এ বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান দেখিয়েছে স্লোভাকিয়ার মতো কিছু দেশ।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রাচীন ইসলামি সঙ্গীত ‘তালা আল-বাদরু আলাইনা’ গেয়ে নিজ দেশে একদল সিরীয় শরণার্থীকে স্বাগত জানায় কানাডার শিশুরা। ইউটিউবের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সেটা বেশ প্রশংসিত হয়।
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর করা সর্বশেষ পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে গত ২৯ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ইকনোমিস্ট। এতে বলা হয়, ২০১৫ সালের শেষ তিন মাসের তুলনায় বর্তমানে ইউরোপে শরণার্থীদের গ্রহণের হার ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপের দেশগুলোতে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ হার সর্বোচ্চ। রেকর্ড পরিমাণ সংখ্যায় শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ড। এতে দেখা যায়, খোলা মনে শরণার্থীদের বরণ করছেন ইউরোপীয়রা।
সিরিয়ার ছয় বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির সর্বাধিক সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ তুরস্ক। নিজ দেশে অবস্থানরত ২৭ লাখ সিরীয় নাগরিকের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে আঙ্কারা। প্রথম থেকেই অবশ্য সিরীয় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ায় তুরস্ক। তবে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে শরণার্থী গ্রহণের হার সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় যাচাই বাছাই শেষে অধিক সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সিরিয়া, ইরিত্রিয়া ও ইরাকের শরণার্থীদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার ৯০ শতাংশের বেশি। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার মাত্র ২৮ শতাংশ। সূত্র: বিবিসি, সিবিসি নিউজ, গার্ডিয়ান, দ্য ইকনোমিস্ট।
/এমপি/








