তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীর সঙ্গে কী হয়েছে? কেন এত আলোচনা

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৯ আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৯

ভারতের কলকাতার রবীন্দ্র সদনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দেশটির সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাল আমলে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি জয় গোস্বামী। কিন্তু তাকে মঞ্চে ডাকার পর দর্শকদের একাংশের আপত্তির মুখে তিনি আর মঞ্চে ওঠেননি। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্যাঙ্গনের পরিবেশ এবং কথিত ‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ঘটনার পর লেখিকা তসলিমা নাসরিন বলেছেন, জয় গোস্বামীর সঙ্গে যা হয়েছে, তা শুধু কবির নয়, তারও অপমান। কারণ তিনিই জয়কে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

কী ঘটেছিল অনুষ্ঠানে

শনিবার (১ আগস্ট) রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তিনি জয় গোস্বামীকে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডাকেন। তবে দর্শক আসনের কয়েকজন দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ জানান। এতে অনুষ্ঠানের পরিবেশে সাময়িক ছন্দপতন ঘটে। শেষ পর্যন্ত জয় গোস্বামী মঞ্চে ওঠেননি। এমনকি তসলিমার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই তিনি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

পরদিন কলকাতার ‘বাংলা আকাদেমি‘-তে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তসলিমা। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করেন এবং ভিন্নমত থাকলেও সবাইকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত।

তার ভাষায়, ‘আমার তো খারাপ লাগবেই। ওটা তো শুধু জয়কে অপমান করা হয়নি। আমাকেও অপমান করা হয়েছে। আমিই তো জয়কে ডেকেছিলাম। আমি আমার ভাষণে বাক্‌স্বাধীনতার কথা বলেছি। আমাদের ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু আমাদের সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে। কারও কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।’

তিনি আরও বলেন, যারা তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বক্তব্যকে সমর্থন করেন, তাদেরই কেউ যদি জয় গোস্বামীকে কথা বলতে না দেন, তাহলে সেটি পরস্পরবিরোধী অবস্থান হয়ে যায়।

তসলিমার বক্তব্যের পর যা বললেন জয় গোস্বামী

তসলিমা নাসরিন জানান, তিনি জয় গোস্বামীর বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে চান। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সাক্ষাৎ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জয়।

তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকেই জেনেছেন যে তসলিমা তার বাড়িতে যেতে চান। তবে তিনি লেখিকার ব্যস্ততার কথা ভেবে ফোন করেননি।

জয়ের ভাষায়, ‘আমার সঙ্গে যে ব্যবহারটা করা হয়েছে, তাতে উনি অপমানিত বোধ করেছেন। এটাই যথেষ্ট।’

একই সঙ্গে তিনি তসলিমার অনুষ্ঠানের বক্তব্যের প্রশংসা করে বলেন, অনভিপ্রেত ঘটনার পরও তিনি যেভাবে অনুষ্ঠানটি সামলে নিয়েছেন, তা ছিল ‘অসাধারণ’।

‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ

ঘটনার পর আরেকটি কারণে আলোচনা আরও তীব্র হয়। জয় গোস্বামী দাবি করেন, স্বাস্থ্য বা চলচ্চিত্রের মতো সাহিত্য ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘থ্রেট কালচার’ বা হুমকি সংস্কৃতি কাজ করেছে।

তাঁর অভিযোগ, ‘থ্রেট কালচারের প্রধান সহ-পরিচালক’ই চান না তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে তাঁর দেখা হোক। যদিও তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি।

জয় আরও বলেন, ২০১৩-১৪ সাল থেকেই সাহিত্য জগতে এই সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। এমন পরিবেশের কারণেই তিনি ২০২৩ সালে মুদ্রণ জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষায়, সময় হলে ধীরে ধীরে সব কারণই প্রকাশ করবেন।

সাহিত্যাঙ্গনের প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যাঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, জয় গোস্বামীর মতো একজন কবিকে মঞ্চে উঠতে না দেওয়া একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি সব ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সাহিত্যে কারও কণ্ঠরোধ হওয়া উচিত নয়। তার দাবি, গত দুই-তিন দশকে সাহিত্যজগতে বিভিন্নভাবে মানুষকে বাদ দেওয়া বা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করার ঘটনাও ঘটেছে।

কবি অংশুমান করও জয় গোস্বামীর সঙ্গে হওয়া আচরণকে ‘অত্যন্ত অন্যায়’ বলে মন্তব্য করেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সাহিত্য ও কবিতার জগতে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি সংস্কৃতি ছিল এবং তিনি নিজেও তার ভুক্তভোগী। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে কিছু মানুষ এই পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও

ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, তিনি জয় গোস্বামীর লেখার ভক্ত হলেও তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে বিভিন্ন ঘটনায় কবির নীরবতার কারণেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তার দাবি, সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন রবীন্দ্র সদনের ঘটনায় দেখা গেছে।

রবীন্দ্র সদনের ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন পশ্চিমবঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্যাঙ্গনের পরিবেশ এবং কথিত ‘থ্রেট কালচার’—এই তিনটি বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

সূত্র: ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম

/ইউএস/
সম্পর্কিত
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী
মধ্যবর্তী নির্বাচন: কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় ট্রাম্প
আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় এ মাসেই
সর্বশেষ খবর
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আগামী সপ্তাহের সম্মেলনে আলোচনা করবেন ইইউ নেতারা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আগামী সপ্তাহের সম্মেলনে আলোচনা করবেন ইইউ নেতারা
কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারালেন ট্রাম্প: তৈরি পোশাকে শুল্ক কমার সম্ভাবনা কতটা?
কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারালেন ট্রাম্প: তৈরি পোশাকে শুল্ক কমার সম্ভাবনা কতটা?
ডেমোক্র্যাটদের জয়ে বিশ্বজুড়ে যেভাবে পড়তে পারে প্রভাব
ডেমোক্র্যাটদের জয়ে বিশ্বজুড়ে যেভাবে পড়তে পারে প্রভাব
বছরে দু’টি ইঞ্জেকশনেই কমবে এইচআইভির ঝুঁকি! অনুমোদন পেলো নতুন ওষুধ
বছরে দু’টি ইঞ্জেকশনেই কমবে এইচআইভির ঝুঁকি! অনুমোদন পেলো নতুন ওষুধ
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
চাঁদাবাজির মামলায় চার্জশিট দাখিল ‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে যা বললো ভারত
বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে যা বললো ভারত
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ছেলের লাশ নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বাবা, কেঁদে কেঁদে বললেন ‌‘মাফ করে দিলাম’
ছেলের লাশ নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বাবা, কেঁদে কেঁদে বললেন ‌‘মাফ করে দিলাম’