নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর এ ঘটনায় চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভূমিধসের কারণে তৈরি হওয়া কোনও প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নেপালে এই ভয়াবহ বন্যা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এমন দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে চীন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, পাথর ও বরফের স্রোত সীমান্তবর্তী এলাকায় আঘাত হানে। এতে নেপালের রাসুয়া জেলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত ১৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দুর্গম এলাকা এবং বেশ কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি?
দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, চীনের ভূখণ্ডে পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই কোনো তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি না। বিশেষ করে সীমান্তের চীনা অংশেও যখন ভূমিধস ও বন্যার ঘটনা ঘটে, তখন নেপালকে আগাম সতর্ক করা সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
নেপালের সাবেক জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান গোবিন্দ রাজ পোখরেল বলেন, চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও উপগ্রহের মাধ্যমে এমন দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হলে তা নেপালকে জানানো যেত কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।
তার মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর তথ্য আদান-প্রদান ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বন্যার পানি এত দ্রুত নেমে এসেছিল যে নদীর তীরে থাকা মানুষ তো বটেই, মানুষকে সতর্ক করতে যাওয়া পুলিশ সদস্যরাও স্রোতে ভেসে যান।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান চীনের
তবে নেপালে চীনা দূতাবাস চীনের ভূখণ্ডে ভূমিধসের কারণে তৈরি কোনও প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে নেপালে এই বন্যা হয়েছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এক বিবৃতিতে চীনা দূতাবাস জানায়, চীনের ভূখণ্ডে তৈরি কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে এই দুর্যোগ ঘটেছে—এমন তথ্য সঠিক নয়।
চীনের দাবি, ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের দিকেই একটি ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মতো হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যাপক ভূমিধস হয়। এতে নেপাল ও চীন—দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাতেই প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।
চীনা দূতাবাসের বক্তব্য, এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের চেয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে হলো এই ভয়াবহ বন্যা?
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের কাছে হিমবাহ অঞ্চল থেকে বরফ ও পাথরের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়ে। ঘটনাটি রাসুওয়াগাধি সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ঘটে বলে জানানো হয়েছে।
ধসে পড়া বরফ ও পাথরের কারণে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ ও পাথর একসঙ্গে নেমে আসে। সেই স্রোত নদীতে গিয়ে পড়ার পর মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।
প্রথমদিকে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণে ওই সময় বড় কোনও ভূমিকম্পের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ঠিক কী কারণে হিমবাহের ওই অংশ ধসে পড়ল, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
হিমালয় অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরাও হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধসকেই এই ভয়াবহ বন্যার অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন।
এদিকে চীনের গিরং বন্দর এলাকাতেও একই দুর্যোগে ভূমিধস হয়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগের প্রকৃত কারণ এবং আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার সুযোগ ছিল কি না—এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সীমান্তবর্তী এলাকায় দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।







