কোটি মানুষের ক্ষুধা মেটাতে সক্ষম যে ‘অজানা’ ফসল, কেন চাষ হয় শুধু এক স্থানেই?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:৫৬ আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:০০

বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধান, গম ও ভুট্টার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ফসলের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এমনই এক সম্ভাবনাময় ফসল হলো ‘এনসেট’। ‘ক্ষুধার বিরুদ্ধে গাছ’, ‘স্টেরয়েডযুক্ত কলা’ কিংবা ‘বিস্ময়কর ফসল’- বিভিন্ন নামে পরিচিত এই উদ্ভিদ ইথিওপিয়ায় ২ কোটিরও বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য। তবে দেশটির বাইরে ফসলটি সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। উচ্চতায় প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত বেড়ে ওঠা এনসেট দেখতে অনেকটা কলাগাছের মতো। তবে এটি প্রকৃতপক্ষে কলা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বিশাল আকৃতির ভেষজ উদ্ভিদ। এর ফল খাওয়ার উপযোগী নয় বলে একে ‘মিথ্যা কলা’ও বলা হয়। তবে ফল নয়, গাছের কাণ্ড ও মাটির নিচের স্ফীত মূল থেকেই তৈরি হয় মানুষের খাবার।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী জেমস বোরেল দীর্ঘদিন ধরে এই ফসলের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। তার মতে, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এনসেটের। অথচ বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ফসলটির সম্ভাবনা এখনও যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।

কীভাবে খাবার হয় এনসেট থেকে?

আফ্রিকার সুদান থেকে মোজাম্বিক পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বুনো এনসেটের দেখা মিললেও চাষাবাদ ও খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার প্রায় পুরোপুরি ইথিওপিয়াকেন্দ্রিক। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় কৃষকেরা এই ফসল চাষ করেন। এনসেটের কাণ্ড আসলে কাঠের তৈরি নয়। একটির ওপর আরেকটি পাতা সজ্জিত হয়ে তৈরি হয় এর ছদ্মকাণ্ড। এই কাণ্ড এবং মাটির নিচের মাংসল মূল গুঁড়া করে খামিরের সঙ্গে মিশিয়ে মাটির নিচে বড় গর্তে রাখা হয়। তিন মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত গাঁজন প্রক্রিয়া শেষে তা দিয়ে তৈরি হয় ইথিওপিয়ার জনপ্রিয় খাবার ‘কোচো’। এটি অনেকটা রুটির মতো। এ ছাড়া গুঁড়া করা শ্বেতসারসমৃদ্ধ মণ্ড থেকে নিংড়ে বের করা তরল ঘন করে সাদা গুঁড়ায় পরিণত করা হয়। পরে পানি মিশিয়ে তা দিয়ে তৈরি করা হয় ডাম্পলিং ও জাউজাতীয় খাবার।

তবে এনসেটের হলুদ বা কমলা রঙের ফল খাওয়ার উপযোগী নয়। বিশাল আকৃতি ও কলাগাছের মতো দেখতে হওয়ায় ‘স্টেরয়েডযুক্ত কলা’ নাম পেলেও খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার মূলত কাণ্ড ও মূলনির্ভর।

অল্প জমিতে বিপুল খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা

এনসেটের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ ফলনক্ষমতা এবং খরা ও রোগবালাই সহ্য করার ক্ষমতা। মাত্র ৬০টি গাছ একটি পাঁচ সদস্যের পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে। ধান, গম ও ভুট্টার মতো অধিকাংশ প্রধান খাদ্যশস্যের জীবনচক্র একটি মৌসুমেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এনসেট বহুবর্ষজীবী ফসল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এটি চাষ ও বাঁচিয়ে রাখা যায়; বারবার নতুন করে রোপণেরও প্রয়োজন হয় না।

২০২১ সালে বোরেল ও তার সহকর্মীদের করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, আফ্রিকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এনসেট চাষ করা সম্ভব। বর্তমান চাষের পরিধি ১২ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো গেলে সাব-সাহারান আফ্রিকায় আরও ১১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এনসেটের বিস্তৃত জলবায়ু সহনশীলতার কারণে বিশ্বের আরও অনেক দেশেও এটি চাষ করা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে না কেন?

অন্য দেশ চাইলে আফ্রিকার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে বুনো এনসেট সংগ্রহ করতে পারে। তবে বোরেলের মতে, ইথিওপিয়ার চাষ করা জাতের তুলনায় এসব বুনো জাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রায় অকার্যকর। এছাড়া ইথিওপিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও প্রতিবেশী কেনিয়া, তানজানিয়া কিংবা উগান্ডায় এনসেট সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুবই সীমিত। এর কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিবন্ধকতার কথা বলছেন বোরেল।

প্রথমত, জীববৈচিত্র্য ও উদ্ভিদের জিনগত সম্পদ চুরির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ভিদ উপাদান স্থানান্তরের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইথিওপিয়ার। ২০১৯ সালে দেশটির স্থানীয় শস্য নিয়ে ডাচদের পেটেন্ট-সংক্রান্ত আইনি বিরোধ এ বিষয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। হাজার বছর ধরে ইথিওপিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার ইনজেরা তৈরিতে ব্যবহৃত এই শস্যের মালিকানা নিয়ে দেশটির নাগরিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।

২০১৯ সালে কিউ গার্ডেনসকে দুটি এনসেট গাছ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল, গবেষণা শেষে উদ্ভিদটির সব উপাদান ধ্বংস করতে হবে। ইথিওপীয় গবেষকদের সঙ্গে চার দশকের সম্পর্কের সুবাদে এই অনুমতি পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আস্থা অর্জন করতে সময় লাগতে পারে।

বোরেল বলেন, ইথিওপিয়ার উদ্ভিদবৈচিত্র্য অনেক সমৃদ্ধ। তাই দেশটি এ সম্পদ রক্ষায় অত্যন্ত সতর্ক। এনসেটের সম্ভাবনা তুলে ধরলেও তা ভাগাভাগি করার সিদ্ধান্ত মূলত ইথিওপিয়ার ওপর নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে দেশটিরও কোনও না কোনও সুবিধা পাওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া এনসেট সংগ্রহের কাজ এখনও বেশ শ্রমসাধ্য। মূলত নারী কৃষকেরাই এই কাজ করেন। ইথিওপিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ প্রক্রিয়া যান্ত্রিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও বড় পরিসরে চালু হয়নি।

এনসেট চাষ ও খাবার তৈরির পদ্ধতিও বেশ জটিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পদ্ধতি গড়ে তুলেছে। খাবার প্রস্তুত করতে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। স্বাদও সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বোরেল নিজে এনসেটের তৈরি বিভিন্ন খাবার উপভোগ করলেও কোচোর স্বাদ কখনও ভালো, কখনও মন্দ বলে উল্লেখ করেছেন।

সূত্র: সিএনএন

/এএস/ 
সম্পর্কিত
পুতিনের দূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প, শিগগির ইউক্রেন-রাশিয়া চুক্তির আশা
ইরানকে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার দিচ্ছে রাশিয়া, ব্যবহার করা যাবে হেলিকপ্টার থেকে
দিওয়ালির আগে মহারাষ্ট্রে ৬৩ কোটি রুপির ভেজাল খাদ্যপণ্য জব্দ
সর্বশেষ খবর
বাইন্যান্স হ্যাকের নেপথ্যে কিমের ‘গোপন অস্ত্র’
বাইন্যান্স হ্যাকের নেপথ্যে কিমের ‘গোপন অস্ত্র’
স্ত্রীর ক্যানসার জয়, বদলে গেছে ক্রিকেট নিয়ে টিকনারের দৃষ্টিভঙ্গি
স্ত্রীর ক্যানসার জয়, বদলে গেছে ক্রিকেট নিয়ে টিকনারের দৃষ্টিভঙ্গি
পুরোনো দিনের আবহে ফাহিমের ‘অশ্রু’
পুরোনো দিনের আবহে ফাহিমের ‘অশ্রু’
আ.লীগকে ফিরিয়ে আনার মাশুল বাবার মতো যেন প্রধানমন্ত্রীকে দিতে না হয়: নাহিদ
আ.লীগকে ফিরিয়ে আনার মাশুল বাবার মতো যেন প্রধানমন্ত্রীকে দিতে না হয়: নাহিদ
সর্বাধিক পঠিত
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
১০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া সিমে তিন দিনে ২ কোটি লেনদেন, যুবক গ্রেফতার
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন ফারজানা আফরোজ
এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন ফারজানা আফরোজ
ক্লাসরুমে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেওয়ায় ৯ শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে টিসি
ক্লাসরুমে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দেওয়ায় ৯ শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে টিসি