৬৩০ কোটি ডলারের বাইন্যান্স ক্রিপ্টো হ্যাকের মতো অভিযানের দায়িত্বে থাকা সেরা হ্যাকারদের নানা সুবিধা দেয় উত্তর কোরিয়া। এর মধ্যে আছে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে প্রশস্ত অ্যাপার্টমেন্ট এবং বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার পুরস্কার।
দলত্যাগী ও বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এক দশকেরও বেশি পুরোনো একটি কর্মসূচির মাধ্যমে নেতা কিম জং উন এ বাহিনী গড়েছেন। প্রতিবছর মাধ্যমিক স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ২০০ শিক্ষার্থীকে বেছে কম্পিউটার প্রকৌশল পড়ানো হয়। তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন শেষ পর্যন্ত হ্যাকার হন। গোষ্ঠীটি শুরুর দিকে অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট চালাত, আর গত মাসে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি ঘটিয়েছে বলে তারা জানান।
২০০৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় পালানোর আগে রাষ্ট্রের হয়ে হ্যাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া দলত্যাগী কিম হিউং-ক্বাং বলেন, তারা আসলে কিম জং উনের গোপন অস্ত্রগুলোর একটি। তার ভাষ্য, অন্য কোনও দেশ এভাবে হ্যাকার গড়ে তোলে না, পদ্ধতিগতভাবে সবচেয়ে মেধাবী শিশুদের খুঁজে শুধু অপারেটিভ বানানোর জন্য। তারা হ্যাকার হতে চায় কি না, তাতে কিছু আসে যায় না।
বাইন্যান্স হ্যাকের দায় উত্তর কোরিয়ার বলে জানিয়েছে এফবিআই ও বাইন্যান্স। পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করেছে। ব্লকচেইন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামে পরিচিত উত্তর কোরীয় গোষ্ঠীর কাজ বলেছে। বছরের পর বছর ধরে উত্তর কোরিয়া এমন অভিযোগকে বানোয়াট রাজনৈতিক উসকানি বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্য হ্যাকার গোষ্ঠীর মধ্যে আছে এপিটি৩৮ নামেও পরিচিত লাজারাস গ্রুপ। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, গোষ্ঠীটি রনিন ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক থেকে কয়েক শ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে। এফবিআই বলেছে, ট্রেডারট্রেইটর লাজারাসের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের আরও বিপজ্জনক ও প্রতিহত করা কঠিন করে তোলে। একের পর এক হ্যাকের পরও তাদের কোনও পরিণতি ভোগ করতে হয় না, ফলে তারা কৌশল নিখুঁত করার সুযোগ পান।
চেইনঅ্যানালাইসিসের এশিয়া-প্যাসিফিক গ্লোবাল সার্ভিসেসের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক অ্যালেক জেব্রিক বলেন, সাইবার অপরাধের জগতে প্রায়ই ভুল করলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনাকে ধরার সুযোগ পায়। তার ভাষ্য, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা এটি করছে শাসকগোষ্ঠীর জন্য, তাই সফলতার পরও তারা চালিয়ে যাবে। ব্যর্থতার পরও চালিয়ে যাবে, কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া খুব কঠিন।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ভুয়া চাকরির সাক্ষাৎকার এবং বিজ্ঞাপনে লুকানো সফটওয়্যার দিয়ে কর্মীদের কম্পিউটারে ঢুকে এরপর অভ্যন্তরীণ এআই টুল ব্যবহার করে হ্যাকাররা সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের ১১ সদস্য দেশের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল জানায়, ট্রেডারট্রেইটর চ্যাটজিপিটি ও ডিপসিক উভয়ের অ্যাকাউন্ট পেয়েছিল।
কঠিন কাজের পরিবেশ
তবু উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার বা অভিজাত প্রযুক্তিকর্মীর জীবন কঠোর, বিশেষ করে মিশন পেলে বা বিদেশে পাঠানো হলে, বলেন সাবেক আইটি কর্মী ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। অ্যাডভোকেসি গ্রুপ পিএসকোরের গত বছরের প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া সাবেক আইটি কর্মীরা জানান, ঠাসাঠাসি জায়গায় বাস, প্রায়ই দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ, নিরন্তর নজরদারি এবং কঠোর লক্ষ্যমাত্রা এর নেতিবাচক দিক।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অর্থ উপার্জনের চাপ সব সময় থাকে। মানসিক চাপে মানুষ আগে ছিল না, এমন স্বাস্থ্যসমস্যায় ভোগে। আইটি কর্মীদের মাসিক ডলার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়, নইলে অপমান ও অন্যান্য শাস্তি পেতে হয় বলে তিনি জানান।
তবু হ্যাকাররা আরও দক্ষ ও উচ্চাভিলাষী হওয়ায় তাদের সাফল্য উত্তর কোরীয় নেতাকে আরও উৎসাহিত করবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। জেব্রিক বলেন, আমরা দেখছি, তাদের আরও বেশি করে আমরা যাকে বিগ গেম হান্টিং বলি, সেদিকে ঝোঁক বাড়ছে। তার ভাষ্য, তারা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করছে, যাদের বড় অঙ্কের তহবিল থাকতে পারে। এগুলো কঠিন লক্ষ্য। তবে বাইন্যান্স ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, প্রাপ্তি অবশ্যই এ সময় ব্যয়কে সার্থক করে তুলতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
স্মার্টফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে অপরিচিত ভাষা অনুবাদ করবেন যেভাবে
এবার কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব মেটার