রক্তঝরা মে: কী ঘটেছিল শিকাগোর হে-মার্কেটে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০১ মে ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩০

১৮৮৬ সালের ১ মে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরটি তখন হয়ে উঠেছিল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জাতীয় আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ইউনিয়ন নেতা, সংস্কারক, সমাজতান্ত্রিক ও সাধারণ শ্রমিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন রাজপথে নেমেছিলেন। তাদের দাবি ছিল মাত্র একটি, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা। কিন্তু সেই ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনটি এক পর্যায়ে রূপ নেয় মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও বিতর্কিত ট্র্যাজেডিতে, যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘মে দিবস’ হিসেবে পরিচিত।

আন্দোলনের শুরু ও সংঘাত

এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত শিকাগোর রাজপথে অন্তত ১৯ বার মিছিল করেন শ্রমিকরা। ১ মে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে ধর্মঘটে যোগ দেন। পরবর্তী কয়েক দিনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। দক্ষ ও অদক্ষ সব ধরনের শ্রমিক মিলে কলকারখানাগুলো অচল করে দেন। তাদের দাবি ছিল আরও জোরালো, ‘দশ ঘণ্টার মজুরিতে আট ঘণ্টা কাজ’।

এই আন্দোলন দমাতে সক্রিয় হয় পুলিশ। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অন্তত ১২ বার সংঘর্ষ হয় পুলিশের, যার মধ্যে তিনবার চলে সরাসরি গুলি। ৩ মে ম্যাককরমিক রিপার প্ল্যান্টে এক সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে অন্তত দুই শ্রমিক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নৈরাজ্যবাদীরা পরের দিন পশ্চিম র‍্যান্ডলফ স্ট্রিটের হে-মার্কেটে এক প্রতিবাদ সভার ডাক দেন। জনতাকে উত্তেজিত করতে বিলি করা এক লিফলেটে লেখা ছিল, ‘প্রতিশোধ!’

রক্তঝরা মে: কী ঘটেছিল শিকাগোর হে-মার্কেটে

বোমা বিস্ফোরণ ও রক্তাক্ত রাজপথ

৪ মে সন্ধ্যায় ডেস প্লেইনস স্ট্রিটে যখন সভা শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি শান্তই ছিল। উপস্থিত থাকা মেয়র কার্টার এইচ হ্যারিসন পুলিশকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে যান। কিন্তু সভার শেষ পর্যায়ে একজন বক্তা আইন অমান্যের ডাক দিলে ইন্সপেক্টর জন বনফিল্ডের নেতৃত্বে ১৭৬ জন পুলিশ সদস্য সভাস্থলে গিয়ে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেন।

ঠিক তখনই পুলিশের দিকে একটি বোমা ছুড়ে মারে অজ্ঞাত কেউ। ঘটনাস্থলেই এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। এতে আটজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৬০ জন আহত হন। জনতা বা শ্রমিকদের মধ্যে ঠিক কতজন নিহত বা আহত হয়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান আজও পাওয়া যায়নি।

রক্তঝরা মে: কী ঘটেছিল শিকাগোর হে-মার্কেটে

বিচারের নামে প্রহসন

হে-মার্কেটের এই বোমা হামলা তৎকালীন ব্যবসায়িক নেতাদের মনে শ্রমিক আন্দোলনের ভীতি আরও বাড়িয়ে দেয়। মেয়র হ্যারিসন তৎক্ষণাৎ সব ধরনের সভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করেন। পুলিশ শ্রমিকদের পিকেটিং বন্ধ করে দেয় এবং প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যমগুলোর কণ্ঠরোধ করা হয়। শিকাগোর তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো কোনও প্রমাণ ছাড়াই একে ‘নৈরাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করতে থাকে এবং বিদেশিদের ওপর আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে।

বোমা নিক্ষেপকারীর পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও আটজন শীর্ষ নৈরাজ্যবাদী নেতাকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। বিচারের নামে এক নজিরবিহীন প্রহসন প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। মামলার বিচারক জোসেফ ই গ্যারি এবং জুরিবোর্ডের ১২ জন সদস্যই আগে থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করতেন। বোমার সঙ্গে আসামিদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকায় প্রসিকিউটররা কেবল তাদের লেখালেখি ও বক্তৃতাকে লক্ষ্যবস্তু করেন। শেষ পর্যন্ত সব আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং সাতজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এই বিচারটি আজও মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারবিভাগীয় ভুল হিসেবে বিবেচিত।

আটজন শীর্ষ নৈরাজ্যবাদী নেতাকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়

শহীদের মর্যাদা ও মে দিবসের জন্ম

১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর কুক কাউন্টি জেলে চারজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়; একজন আগেই আত্মহত্যা করেন। এই পাঁচজনের শেষযাত্রায় লক্ষাধিক মানুষ শিকাগোর রাজপথে সমবেত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড জেলবন্দি বাকি তিন আসামিকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেন। তিনি স্বীকার করেন যে, প্রমাণের অভাব এবং একপাক্ষিক বিচারের মাধ্যমেই তাদের সাজা দেওয়া হয়েছিল।

শিকাগোর এই আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ১ মে তারিখটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন শুরু করে। বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশ এটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করে।

স্মৃতি ও বিতর্ক

শীতল যুদ্ধের সময় আমেরিকায় মে দিবসকে একটি ‘কমিউনিস্ট ছুটির দিন’ হিসেবে দেখা হতো। যার ফলে ১৯৫৫ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ১ মে তারিখটিকে ‘আনুগত্য দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে আশির দশকে আবার হে-মার্কেটের ঘটনা নিয়ে মার্কিন জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়।

১৮৯৩ সালে ওয়াল্ডহেইম কবরস্থানে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে ‘হে-মার্কেট শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়। অন্যদিকে হে-মার্কেটে নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে ১৮৮৯ সালে একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে ছাত্র আন্দোলনের সময় সেই মূর্তিটি ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে সেটি শিকাগো পুলিশ অ্যাকাডেমিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

রক্তাক্ত সেই ইতিহাস আজ ম্যুরাল, স্মৃতিস্তম্ভ আর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে শ্রমের অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে টিকে আছে।

 

/এএ/
সম্পর্কিত
ইরান-মার্কিন সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ দফা প্রকাশ করলো অ্যাক্সিওস
টেক্সাসে ঘুর্ণিঝড় ‘আর্থার’-এর আঘাত, বন্যার শঙ্কা
শুক্রবার নয়, আজই সই হতে পারে ইরান-মার্কিন চুক্তি!
সর্বশেষ খবর
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
শেষ মুহূর্তে পানামার হৃদয় ভাঙলো ঘানা
শেষ মুহূর্তে পানামার হৃদয় ভাঙলো ঘানা
ফ্ল্যাট বাসায় দুই সন্তানের মায়ের গলা কাটা লাশ
ফ্ল্যাট বাসায় দুই সন্তানের মায়ের গলা কাটা লাশ
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
সর্বাধিক পঠিত
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
‘বাক্সের কাঁকড়া’: যে কারণে নিজের পরিবারই আপনার উন্নতিতে অখুশি!
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর আগেই ভেঙে পড়লো সভামঞ্চের প্যান্ডেল
ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক
ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ৭ দাবির সঙ্গে একমত গভর্নর
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা
অবশেষে মাকে নিয়ে সুখবর পেলেন ভোজিনহা