১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বরের এক অন্ধকার রাত। শিকাগোর উত্তর অ্যাভিনিউ ধরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে একটি সেডান গাড়ি। গাড়ির চালকের আসনে কার্ড প্রস্তুতকারী এক নামি প্রতিষ্ঠানের ৭২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ধনকুবের প্রেসিডেন্ট চার্লস এস রস। পাশে তার দীর্ঘদিনের সাবেক সচিব ও বিশ্বস্ত বন্ধু ফ্লোরেন্স ফ্রিহেগ।
হঠাৎ পেছনের একটি গাড়ি থেকে তীব্র আলো এসে পড়ে রসের চোখে। আতঙ্কিত কণ্ঠে রস বলে উঠলেন, ‘পেছনের গাড়িটা অনেকক্ষণ ধরে অস্বাভাবিক আলো জ্বালিয়ে আমাদের অনুসরণ করছে। আমার বিষয়টাকে ভালো ঠেকছে না। রাস্তা ছেড়ে গাড়িটা একপাশে সরিয়ে ওকে পেরিয়ে যেতে দিই।’
গাড়িটি রাস্তার পাশে থামাতেই পেছনের গাড়িটি এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়ায়। হাতে পিস্তল নিয়ে বের হয়ে আসে এক তরুণ। সোজা রসের দরজার কাছে গিয়ে লক খোলার চেষ্টা করে সে। গ্লাসে পিস্তলের নল ঠুকে হুমকি দেয়, দরজা না খুললে গুলি করে বুক ঝাঁজরা করে দেবে। রস বাধ্য হয়ে দরজা খুলতেই শুরু হয় তল্লাশি। দ্রুত তাকে অন্য গাড়িতে তুলে নেয় অপরাধীরা।
গর্জে উঠে ডাকাত দলের প্রধান চিৎকার করে বললো, ‘এটা অপহরণ! আমার বসের নির্দেশেই তোকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি।’
পাশে থাকা ফ্লোরেন্স প্রবীণ রসের শারীরিক অসুস্থতা ও হৃদরোগের কথা জানিয়ে কাকুতি-মিনতি শুরু করেন। কিন্তু ডাকাত তরুণটি কর্কশ কণ্ঠে গর্জে উঠল, ‘তুই তার কে? মেয়ে না প্রেমিকা?’
‘না, আমি কেবল একজন বন্ধু,’ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জবাব দেন ফ্লোরেন্স।
‘কত দিতে পারবে সে আমাদের, ৫০ লাখ না ২৫ লাখ,’ পিস্তলের মুখ ফ্লোরেন্সের কাঁধে চেপে ধরে জানতে চাইল অপহরণকারী। ফ্লোরেন্স নিজের ব্যাগে থাকা ৮৫ ডলার দিয়ে রসকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে অপরাধীরা ব্যাগ থেকে টাকা কেড়ে নেয়। ফ্লোরেন্সকে মেঝেকে শুয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে হুমকি দেয়, ‘আমরা চলে যাওয়ার পর পুলিশে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করবি না, করলে ওকে মেরে ফেলব।’
অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে যায় অপরাধীদের গাড়ি। এফবিআইয়ের ইতিহাসে অন্যতম এক দুর্ধর্ষ ও রোমহর্ষক অপহরণ রহস্যের সূচনা ঘটে সেই রাতে।
নিখুঁত ছক ও ৫০ হাজার ডলারের মুক্তিপণ
অপহৃত রসকে নিয়ে অপরাধীরা উইসকনসিন হয়ে মিনেসোটার এমিলির এক তুষারাবৃত গভীর জঙ্গলে তৈরি করা গোপন ভূগর্ভস্থ আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে মূল মাস্টারমাইন্ড জন হেনরি সিডলান্ড এবং তার সহযোগী জেমস অ্যাটউড গ্রে রসকে দিয়ে একটি চিঠি লেখায়। রস প্রথমে মাত্র ৫ হাজার ডলার মুক্তিপণ দিতে রাজি হলেও সিডলান্ড তা কৌশলে বদলে ৫০ হাজার ডলারে উন্নীত করে।
পরবর্তী তিন সপ্তাহে শিকাগোর বিভিন্ন ঠিকানায় একের পর টাইপ করা ও হাতে লেখা নাটকীয় মুক্তিপণের চিঠি পৌঁছাতে থাকে। অপরাধীরা তাদের সাংকেতিক নাম দেয় ‘আলবি’ (অ্যাল ক্যাপোনের সহযোগী নয়)। একটি চিঠিতে তারা লিখে, “রসের সঙ্গে খুব বেশি ‘ভিটামিন জি’ (এফবিআই এজেন্ট) ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সময় ও ৩৯৫ মাইলের মোটরসাইকেল চলাচলের রুট বেঁধে দেওয়া হয়। নির্দেশ মতো শিকাগো ট্রিবিউনে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এবং ১৯৩৭ সালের ৮ অক্টোবর শিকাগোর রকল্যান্ড মহাসড়কে মোটরসাইকেল থেকে ৫০ হাজার ডলার ভর্তি একটি লেদার ব্যাগ নির্দিষ্ট সঙ্কেতে ছুঁড়ে ফেলা হয়। সিডলান্ড ও তার সহযোগী মুক্তিপণের টাকা তুলে নিয়ে জঙ্গল থেকে চম্পট দেয়। সিডলান্ড নিজের ঝুলিতে রাখে ৩০ হাজার ডলার আর গ্রে-কে দেয় ২০ হাজার ডলার।
সঙ্গীকে খুন ও ‘খুঁতহীন অপরাধের’ সমাপ্তি
কিন্তু সিডলান্ডের আত্মবিশ্বাস ও অহংকার বেশি দিন টেকেনি। সে এটিকে ভেবেছিল ‘একটি নিখুঁত অপরাধ’। নিজের অপরাধের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ও সহযোগী জেমস অ্যাটউড গ্রে-কে ভাগ দিতে রাজি ছিল না সিডলান্ড। ৯ অক্টোবর রাতে উইসকনসিনের স্পুনারের কাছে দ্বিতীয় এক অন্ধকার গর্তে রস ও গ্রেকে নিয়ে যায় সে। সেখানে ভাগাভাগি নিয়ে সামান্য তর্কাতর্কির জের ধরে সহকর্মী গ্রে-কে গুলি করে হত্যা করে সিডলান্ড। পতনের আঘাতে রস সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাকে নির্মমভাবে মাথায় গুলি করে হত্যা করে একই গর্তে মাটি চাপা দেয় সে।
সিডলান্ড ভেবেছিল, কোনও সাক্ষী না থাকায় এফবিআই তাকে কখনোই ছুঁতে পারবে না। কিন্তু তাড়া করা মুক্তিপণের নোটে থাকা ডলারের সিরিয়াল নম্বরই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এফবিআই পরিচালক জে. এডগার হুভারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ তল্লাশি অভিযান শুরু হয়।
সিডলান্ডের একটি মারাত্মক দুর্বলতা ছিল, সেটি হলো রেস ট্র্যাকে বাজি ধরা। ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা আনিতা রেস ট্র্যাকে জুয়া খেলতে যায় সে। এফবিআই এজেন্টরা ছদ্মবেশে টিকিটের ক্যাশিয়ার হয়ে ওত পেতে ছিল। বাজি ধরতে গিয়ে একটি ২০ ডলারের মুক্তিপণের নোট হাতবদল করতেই সঙ্কেত পেয়ে চারপাশে ছেঁকে ধরে এজেন্টরা। গ্রেফতার হয় ‘পিটার অ্যান্ডার’ ছদ্মনামধারী জন হেনরি সিডলান্ড।
তুন্দ্রার বরফে হাড়হিম করা আবিষ্কার
প্রথমে অপরাধের কথা অস্বীকার করলেও এফবিআই প্রধান হুভারের দীর্ঘ জেরার মুখে ২৮ পৃষ্ঠার এক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সিডলান্ড। সে স্বীকার করে কীভাবে সে বন্ধুকে খুন করেছে এবং রসকেও হত্যা করে গর্তে পুঁতে রেখেছে।
তুষারে ঢাকা মিনেসোটা ও উইসকনসিনের বনে পুলিশ নিয়ে অভিযান চালায় এফবিআই। জঙ্গল, বরফ আর পরিত্যক্ত রেললাইনের পাশের পাইন গাছ থেকে একে একে উঠে আসে একটি টাইপরাইটারের বাক্সভর্তি ৩২ হাজার ৬৪৫ ডলার এবং অবশেষে তুষারে ঢাকা ভূগর্ভস্থ ‘মৃত্যুকূপ’। গর্তের ভেতরে নগ্ন ও গুলবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয় জেমস অ্যাটউড গ্রে এবং চার্লস এস রসের গলিত মরদেহ। বরফের ওপর হাতকড়া পরা অবস্থাতেই সিডলান্ড এফবিআই অফিসারের ওপর হামলার শেষ চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়।
১৯৩৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শিকাগোর ফেডারেল আদালতে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয় ২৮ বছর ছুঁইছুঁই সিডলান্ড। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৯৩৮ সালের ১৪ জুলাই শিকাগোর ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে কার্যকর করা হয় মৃত্যুর ঠিক ১৩ দিন পর তার ২৮তম জন্মদিন উদযাপনের কথা ছিল।
সূত্র: এফবিআই
অর্থনীতি চাঙা, তবু কেন দরপতন ভারতের শেয়ার বাজারে
গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে ইসরায়েল: সিআইএ’র গোপন প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কী, কেন এটি ট্রাম্পের জন্য বড় পরীক্ষা
রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার সাবেক জার্মান গোয়েন্দাপ্রধান