যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে খণ্ডিত বিএমডব্লিউ-ইসুজু আমদানি, কাস্টমসের তদন্ত

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫১ আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫১

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ ঘোষণা দিয়ে খণ্ডিত গাড়ি আমদানির ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি সন্দেহভাজন পণ্যচালানের কায়িক পরীক্ষায় একটি খণ্ডিত বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার, একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আই গাড়ির সামনের অংশ এবং পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দরে চালানটির কায়িক পরীক্ষা করে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য শনাক্ত করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি)। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সংস্থাটি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।

যন্ত্রাংশের নামে গাড়ি

কাস্টমস গোয়েন্দা জানায়, চালানটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আয়াজ অটো ইন্টারন্যাশনাল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরব জাপান ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস কোম্পানি এলএলসি থেকে চালানটি রফতানি করা হয়েছে। 

চালানটিতে ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের ধরন ও অবস্থার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

পরীক্ষার সময় প্রথমে খণ্ডিত অবস্থায় একটি দুই আসনের বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে গাড়িটির মডেল ‘এস ড্রাইভ ২৩আই’ বলে ধারণা করছে কাস্টমস। গাড়িটির ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি এবং এটি ২০০৯ সালের মডেল হতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে গাড়িটির সঠিক মডেল, উৎপাদন সাল, চেসিস নম্বর, ভিআইএন এবং বাংলাদেশে আমদানির বৈধতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও কারিগরি যাচাই শেষে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা। 

পাওয়া গেছে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অংশ

চালানটিতে আরও পাওয়া গেছে একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আই গাড়ির খণ্ডিত সামনের অংশ। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি ২০১৬ সালের মডেল এবং এর ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার সিসি। 

তবে এই গাড়িটির ক্ষেত্রে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এর বাকি অংশ নিয়ে। কারণ চালানটিতে গাড়িটির শুধু সামনের অর্ধাংশ পাওয়া গেছে। গাড়িটির বাকি অংশ এর আগে অন্য কোনো চালানে দেশে আনা হয়েছে কি না, অথবা পরবর্তী কোনো চালানে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা— তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা। 

কাস্টমস কর্মকর্তারা মনে করছেন, খণ্ডিত গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা চালানে এনে পরে সেগুলো পুনরায় সংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক

বিএমডব্লিউর পাশাপাশি চালানটিতে পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাকও পাওয়া গেছে। এসব ট্রাকের কেবিনের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্যাক করে রাখা হয়েছিল। 

এ ছাড়া চালানটিতে আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। ফলে কেবল ঘোষণায় অসঙ্গতি নয়, পণ্য আমদানির প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

কাস্টমস গোয়েন্দা এখন উদ্ধার হওয়া সব পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্রতিটি গাড়ি বা গাড়ির অংশের চেসিস নম্বর, ভিআইএন, ইঞ্জিনের তথ্য এবং প্রকৃত মূল্য যাচাই করা হচ্ছে। 

শুল্ক-কর ফাঁকির আশঙ্কা

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানিয়েছে, ঘোষিত পণ্য এবং কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে মূলত কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে— ঘোষণায় কারচুপি করা হয়েছে কি না, প্রকৃত পণ্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা হয়েছে কি না এবং খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা আলাদা চালানে এনে পরে সম্পূর্ণ গাড়ি হিসেবে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না। 

বিশেষ করে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের বাকি অর্ধাংশের অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্ট অন্য চালানের তথ্যও যাচাই করা হবে। একই আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকের মাধ্যমে এর আগে বা পরে একই ধরনের কোনো চালান এসেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নথিপত্র ও প্রকৃত মূল্য যাচাই

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার হওয়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ আমদানি করা গাড়ি বা গাড়ির অংশের মূল্য কম দেখানো হলে তার প্রভাব পড়তে পারে শুল্ক-কর নির্ধারণে। 

এ কারণে প্রতিটি গাড়ির মডেল, উৎপাদন সাল, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, চেসিস নম্বর ও ভিআইএন যাচাই করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আমদানি নথি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব এন্ট্রি এবং অন্যান্য কাগজপত্রও পরীক্ষা করা হচ্ছে। 

আমদানি করা পণ্যগুলো দেশের প্রচলিত আমদানি নীতি ও শুল্ক-কর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাই করবে কাস্টমস।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানিয়েছে, তদন্ত শেষে ঘোষণায় কারচুপি, শুল্ক-কর ফাঁকি কিংবা আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধিবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ বা এ ধরনের সাধারণ পণ্যের ঘোষণার আড়ালে গাড়ি কিংবা গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমদানির চেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু একটি চালান পরীক্ষা করেই বিষয়টি শেষ করা হচ্ছে না। একই ধরনের পণ্য আমদানির অতীত ও পরবর্তী চালানও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা চালানে এনে দেশে সম্পূর্ণ গাড়ি তৈরি বা পুনঃসংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। 

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
শাহজালালে তিন যাত্রীর লাগেজে মিললো ৩২ লাখ টাকারও বেশি সিগারেট
এবার ফেঁসে যাচ্ছেন কোটি টাকার গাড়ির মালিকরা  
সুতা আমদানির নিয়ম বদল: নতুন জটিলতায় পোশাক কারখানার মালিকরা 
সর্বশেষ খবর
যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম-অনলাইন সেবা
যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম-অনলাইন সেবা
গোপন রাজনীতির এক চিরকুমার তাত্ত্বিক নেতা, ‘ক্রসফায়ারে’ শেষ পরিণতি
গোপন রাজনীতির এক চিরকুমার তাত্ত্বিক নেতা, ‘ক্রসফায়ারে’ শেষ পরিণতি
ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের
ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের
তুরস্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন জামায়াত আমির
তুরস্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন জামায়াত আমির
সর্বাধিক পঠিত
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নতুন গাইডলাইন দিলো আইভ্যাক
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
১৯৪৭ সালের পর আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে প্রথম কোনও নৌযান
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
মান-অভিমান ভুলে এক মঞ্চে ফিরছেন জিৎ-দেব
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
‘মানবিক’ বিবেচনায় যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মুক্তি চাইলেন ছাত্রদল নেতা
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই
কবে বিয়ে করবেন কেয়া পায়েল, জানালেন নিজেই