গত জুন মাসে বাংলাদেশের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয়েছে। এতদিন ধরে খাদ্য বণ্টন কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেসব রোহিঙ্গাদের নির্ধারণ করে দিয়েছিল, ক্যাম্পগুলোতে তারাই নেতৃত্ব করত। এসব রোহিঙ্গা নেতারা মাঝি নামে পরিচিত। নতুন নির্বাচিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মাঝিরা এখনও কাজ করছে যেমন তারা আগে থেকেই হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিল। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, নতুন যে নেতৃত্ব শিবিরের রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার দায়িত্ব পেয়েছে, তাদের জন্য নির্বাচনের উদ্যোগটি নিয়েছিল জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে বহু সংস্থা।
কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত শালবন আশ্রয় শিবিরে গত জুনে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয় শিবিরটি বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের কাছে অবস্থিত হলেও এটির সরকারি অনুমোদন নেই। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, অ্যাডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিলিফ এজেন্সি এবং বাংলাদেশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেখানে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয়েছে।
মূলত শিবিরের বাসিন্দাদের মধ্যে হওয়া মতবিরোধ নিরসন ও এনজিওদের উন্নয়ন তৎপরতায় সহায়তা করবেন এসব নতুন নেতা। ক্যাম্প ইনচার্জের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। ১৬ হাজার বাসিন্দা অধ্যুষিত শালবন আশ্রয় শিবিরে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতি ব্লক থেকে নেওয়া হয়েছে চারজন করে মোট বারো জন প্রতিনিধি। সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত নয়াপাড়া শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমরা তাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারি না। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে আমাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তারা আসতে পারবেন।’
শালবন আশ্রয় শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলোর মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়ক এসএম লিয়াকত আলি বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং পারস্পারিক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রচার করা হয়েছিল। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইনি অধিকার, দায়-দায়িত্ব, কর্ম প্রণালি ও জরুরি অবস্থায় কীভাবে কাজ করতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা সহজ ছিল না শালবন আশ্রয় শিবিরে। সেখানে আগে থেকেই সক্রিয় মাঝিরা। খাদ্য বিতরণের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কিছু রোহিঙ্গাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। এসব নেতারা মাঝি হিসেবে পরিচিত। শালবন শিবিরে যাতে নতুন কোনও নেতৃত্ব দাঁড়াতে না পারে সেজন্য তারা হুমকি-ধামকি দেওয়া শুরু করেছিল। লিয়াকত আলি জানিয়েছেন, একদিকে তারা যেমন প্রার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে অন্যদিকে তেমনি নিজেদের দিকে জনসমর্থন ধরে রাখতে খাদ্য বণ্টনের সময় পক্ষপাতিত্ব করেছে। তাদের হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করেই নতুন নেতৃত্ব কাজ করছে।
রোহিঙ্গা নারী নূর বেগম আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘মাঝিদের কর্তৃত্বের চেয়ে শিবিরের নারীদের নেতৃত্ব ভালো। নতুন নেতৃত্বের কারণে একজন নারী হিসেবে আমার সমস্যাটি তুলে ধরাটা অনেক সহজ হবে। নারী হওয়ায় তারা নারীর সমস্যা আরও ভালোভাবে বুঝবেন।’ তার পাশে বসে থাকা স্বর্ণা বেগমও এ কথায় সমর্থন দেন।
শালবন রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্ব পাওয়া মতুন নেতারা প্রতি সপ্তাহে বৈঠক করেন। আগস্টের শুরুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেসবের মধ্যে মাঝিদের হুমকি-ধামকি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। এসএম লিয়াকত আলি তাদেরকে বলেছেন, ‘মাঝিরা আপনাদেরকে তাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হুমকি বলে মনে করে। দয়া করে আপনারা তাদের স্তরে নেমে যাবেন না। তাদের হুমকির জবাবে সবচেয়ে ভালো যা আপনারা করতে পারেন তা হলো নিজেদের সম্প্রদায়ের লোকজনদের সেবার বিষয়ে সবটুকু নিংড়ে দেওয়া। অন্যদের জন্য আপনাদের একটি উদাহরণ তৈরি করতে হবে।’








