পাকিস্তানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত সপ্তাহ থেকে চলমান বিক্ষোভ সহিংসতায় গড়াচ্ছে। হাজারো মানুষ রাজপথে নেমেছেন এবং নিজেদের বিদ্যুতের বিলের কপি আগুনে পোড়াচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রাখছেন, সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে। জীবনযাত্রার মূল্যবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক বিরোধ নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
গত তিন মাসে পাকিস্তানে বিদ্যুতের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। দেশটিতে প্রতি কিলোওয়াটের দাম এখন ৫০ রুপি। জুন মাসে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ২৬২ রুপি থাকলে সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৩০৫ রুপি।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। মূল্যস্ফীতি রেকর্ড মাত্রায় বেড়ে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। গত বছর এপ্রিলে পার্লামেন্টে আস্থাভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এছাড়া গত বছর বন্যায় দেশটিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গত সপ্তাহে করাচিতে বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে ওঠেন। কে-ইলেক্ট্রিক নামের একটি কোম্পানির কর্মীদের ওপর হামলা চালান বিক্ষুব্ধরা।
খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জ্বালানি দফতর পুলিশের সুরক্ষা চেয়েছে। বিক্ষোভকারীরা দফতরের কর্মী ও স্থাপনায় হামলার হুমকি দেওয়ার পর এই অনুরোধ জানানো হয়।
ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন অল করাচি তাজির ইত্তেহাদের সভাপতি আতিক মির বলেছেন, ক্ষুধা মানুষের খারাপ দিকগুলোকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
জামায়াত-ই-ইসলামি দলের ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানজুড়ে বন্ধ ছিল দোকানপাট। শুক্র ও শনিবার দোকান বন্ধের জন্য প্রায় ১০ বিলিয়ন রুপি ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
করোনা মহামারির আগে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন মোহাম্মদ নিয়াজ। কিন্তু মহামারির কারণে তিনি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এখন তিনি প্রতিমাসে ৩০ হাজার রুপি আয় করছেন। কিন্তু এতে তার ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তার কথায়, খাবারের দাম আকাশছোঁয়া, গত তিন মাসে বিদ্যুতের বিল দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ দিনে মাত্র ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি আমরা।
তিনি বলেন, দুই সন্তানের স্কুলের ফি, বাস ভাড়া, বই ও সরঞ্জাম বাবদ ৬ হাজার রুপি আলাদা করে রাখার পর খাবারের জন্য তেমন কোনও অর্থ থাকছে না।
পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স-এর তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালের আগস্টের পর ময়দার দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এর অর্থ হলো রুটির দামও দ্বিগুণ। চিনিও এখন অনেক ব্যয়বহুল।
২০ বছর ধরে করাচিতে বসবাস করা পারভিন রিয়াজ (৫৪) বলেছেন, তিনি হয়তো পাঞ্জাব প্রদেশে নিজের গ্রামে ফিরে যাবেন। তার কথায়, ‘দরিদ্রদের জন্য করাচি নয়।’ তিনি প্রতি মাসে ২৫ হাজার রুপি আয় করেন, তার স্বামীও সমান অর্থ উপার্জন করেন। তাদের ছয় সন্তান ও দুই নাতি রয়েছে।
পারভিন বলেন, গত এক বছরে খাবারের দাম শুধু বেড়েই চলেছে। দুই বছর আগের তুলনায় দৈনন্দিন মুদি সরঞ্জামের ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে।
করাচি ইলেক্ট্রিকের যোগাযোগ পরিচালক ইমরান রানা বলেছেন, বিদ্যুতের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে। তবু তাদের ভুগতে হচ্ছে। সহিংসতা কোনও সমাধান নয়। বিদ্যুৎ কোম্পানিতে কর্মরতদের ওপর হামলা পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে।
জ্বালানিমন্ত্রী মুহাম্মদ আলি বলেছেন, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছে। কিন্তু অনেক ইস্যু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্বে তেলের চড়া দামের অর্থ হলো পাকিস্তানে এগুলোর দাম আরও বেশি।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা সীমিত। আগের সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে। চুক্তির শর্ত ছিল মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রত্যাহার।









