চীনের সামরিক কুচকাওয়াজ ঘিরে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের অভূতপূর্ব উপস্থিতি বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই দৃশ্যকে আখ্যা দিয়েছে ‘স্বৈরশাসক জোটের’ উত্থান হিসেবে। তবে কূটনীতিক, বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতাদের মতে, এই জোট আপাতদৃষ্টিতে যতটা ভয়াবহ মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটা দৃঢ় নয়। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে।
ঐক্যের সীমাবদ্ধতা
চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার একসঙ্গে উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রতীকী বার্তা দিলেও আনুষ্ঠানিক কোনও ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন হয়নি। মূল অর্থনৈতিক চুক্তিগুলোও এখনও অনিশ্চিত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সহযোগিতার অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি হয়তো আসন্ন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভিক্টর চা বলেন, ‘আমি একে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ঘোষণাপত্র হিসেবে দেখি না। বরং এটি ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির ভিত্তিতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলার ঘোষণা।’
তবু যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিজ্ঞ কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন যে, ‘চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া নীতিগত বিষয়গুলোতে ভিন্নমত পোষণ করলেও যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরোধিতায় তারা একমত। এটাই বড় বার্তা।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
জাপানের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা তার পদত্যাগী ভাষণে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশীরা পাশাপাশি দাঁড়ানো, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কায়া কালাসও সমাবেশকে ‘স্বৈরশাসক জোট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, শি, পুতিন ও কিম তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। ক্রেমলিন অবশ্য এই মন্তব্যকে ‘ব্যঙ্গাত্মক’ বলেই উড়িয়ে দিয়েছে।
কুচকাওয়াজের আড়ালে কূটনীতি
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামরিক কুচকাওয়াজ শি’র জন্য ছিল কূটনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ, পুতিনের জন্য আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ভাঙার সুযোগ এবং কিমের জন্য তার নিষিদ্ধ পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি এক ধরনের নীরব সমর্থন লাভ। তবে একসঙ্গে বসে ত্রিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে দেশগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সহযোগিতা এখনও দূরবর্তী ব্যাপার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রকল্প ৩৮ নর্থ-এর পরিচালক জেনি টাউন বলেন, ‘চীন আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা শুরু হচ্ছে এমন বার্তা দেয়নি।’ এর অর্থ, তিন দেশের যৌথ সামরিক মহড়া এখনও অচিন্তনীয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধোঁয়াশা
চীন-রাশিয়ার মধ্যে একটি বৃহৎ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে চুক্তির খসড়া ঘোষণা করা হলেও বেইজিংয়ের সরকারি বিবৃতিতে এ বিষয়ে কোনও উল্লেখ ছিল না। প্রকল্পের দাম ও শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কৃষিখাতে রাশিয়ার শীতকালীন গমের বাজার খোলার আশা নিয়েও চীন ইতিবাচক কোনও ইঙ্গিত দেয়নি।
তবে পশ্চিমা পুঁজিবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন রুশ কোম্পানির জন্য চীনের বন্ড বাজার আংশিক খোলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিন্তু মস্কো চাইছে এ ধরনের বন্ড রাশিয়ার ভেতরেই ইস্যু হোক।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন বার্তা
শি’র সঙ্গে কিম’র ছয় বছরে প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে বাণিজ্য আলোচনাই প্রধান ইস্যু ছিল বলে ধারণা কূটনীতিকদের। আশ্চর্যের বিষয়, বেইজিংয়ের সরকারি বিবৃতিতে এবার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ শব্দটির উল্লেখই করা হয়নি। বিশ্লেষকেরা একে কিমের প্রতি বড় রকমের ছাড় হিসেবে দেখছেন।
চীনা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শি পরে কিমকে চিঠি লিখে ‘কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের চীনে অবস্থানসহ কয়েকটি জটিল ইস্যু অনিষ্পন্নই রয়ে গেছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্ক
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শি ও কিমের সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাষা মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষির জন্যই কৌশল। অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনে অংশ নেবেন ট্রাম্প। সেখানে শি’র সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা চলছে।
২০১৯ সালের পর ট্রাম্প-কিম বৈঠক পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এখনও ক্ষীণ। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ সদস্য লি সিয়ং-কিউন বলেন, কূটনৈতিক তৎপরতার এই স্রোত ট্রাম্পের সঙ্গে নতুন করে সংলাপের পথ খুলে দিতে পারে কি না, গোয়েন্দারা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সামনে কী?
চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক হয়তো এখনও পূর্ণাঙ্গ জোট নয়। তবে এই সমন্বিত উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতীকী বার্তা বহন করছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি কোনও নতুন শৃঙ্খলার সূচনা নয়, বরং পুরোনো শৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কৌশল।
তবে একাধিক পর্যবেক্ষকের মতে, যদি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকগুলো বাস্তবে রূপ নেয়, তবে এই তথাকথিত ‘স্বৈরশাসক জোট’ বিশ্বকূটনীতির ভারসাম্যে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।









