ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো আবারও কয়লার দিকে ঝুঁকছে। লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে মহাদেশটির বড় বড় অর্থনীতিগুলো। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল, যার বড় একটি অংশ আসে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধাবস্থায় এই রুটটি বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় বিপাকে পড়েছে এই অঞ্চল।
জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে ভারত গ্রীষ্মকালীন বাড়তি চাহিদা পূরণে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া তাদের উৎপাদিত কয়লা রফতানির বদলে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার পথে এলএনজিকে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কয়লার চেয়ে পরিচ্ছন্ন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় এর বাজার বাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেই লক্ষ্যমাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ কয়লা উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী দেশ চীন ২০২১ সাল থেকেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেকর্ড পরিমাণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ ভারত আসন্ন প্রচণ্ড দাবদাহ মোকাবিলায় ২৭০ গিগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কয়লার ওপর ভরসা করছে। দেশটির কাছে বর্তমানে তিন মাসের কয়লা মজুত রয়েছে।
এনার্জি বিশেষজ্ঞ সন্দীপ পাই জানান, সম্প্রতি ভারতের ৯২ হাজার ৭০০ টনের দুটি এলপিজিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হলেও এগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বদলে সার কারখানার মতো শিল্পখাতে ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি।
কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধিতে বড় শহরগুলোতে ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, কয়লা পোড়ানোয় সৃষ্ট সূক্ষ্ম কণা ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে মিশে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় এবং ভারতের শহরগুলোতে ইতোমধ্যে বায়ুদূষণ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দিল্লিতে রান্নার কাজেও কয়লা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কয়লা একটি সাময়িক সমাধান হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। পাওয়ারিং পাস্ট কোল অ্যালায়েন্স-এর জুলিয়া স্কোরুপস্কা বলেন, এই সংকট একটি বড় সতর্কতা। কয়লার ওপর নির্ভরতা এশিয়াকে ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
দক্ষিণ কোরিয়া ২০৪০ সালের মধ্যে কয়লা থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এলএনজি সংকট মেটাতে কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একটি নেতিবাচক নজির হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে ২০২৪ সালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ২০২০ সালের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে।








