অধিকাংশ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় বিরিয়ানির উদ্ভাবক কোন দেশ, উত্তর আসবে, ভারত। তবে বিরিয়ানি নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর ভিন্ন ইতিহাস। ‘বিরিয়ানি’ শব্দটি মূলত ফার্সি ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ভেজে নেওয়া চাল’। এই একটি শব্দই ইঙ্গিত দেয় যে, সুস্বাদু এই খাবারের ইতিহাস কেবল এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় পথ অতিক্রম করে আজকের রূপ পেয়েছে।
বিরিয়ানির জন্ম কি পারস্যে?
অনেক রন্ধন ইতিহাসবিদ বিরিয়ানির শিকড় খুঁজে পান প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান), ভারতে এর আবির্ভাবের বহু আগে। শবনম নাসিমি নামে এক গবেষকের এক ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সাফাভি ও তৈমুরীয় সাম্রাজ্যের রাজকীয় রান্নাঘরে চাল ঘিতে বা চর্বিতে ভেজে তার সঙ্গে মাংস, শুকনো ফল, বাদাম ও জাফরান স্তরে স্তরে সাজিয়ে শক্ত করে মুখ বন্ধ পাত্রে অল্প আঁচে রান্না করা হতো। এই পদ্ধতিটিই দক্ষিণ এশিয়ায় আজ ‘দম’ রান্না নামে পরিচিত। অল্প আঁচে রান্নার এই কৌশলকেই পরবর্তীতে বিরিয়ানির মূল ভিত্তি বলে মনে করা হয়।
ধারণা করা হয়, প্রাচীন বাণিজ্য পথ ধরে পারস্যের ইস্পাহান, নিশাপুর ও খোরসান হয়ে ব্যবসায়ী, সেনা এবং ভবঘুরে কবিদের হাত ধরে এই খাবারটি প্রথমে হেরাত ও কাবুলে পৌঁছায়।
বিরিয়ানির আফগান অধ্যায়
জনশ্রুতি রয়েছে, পঞ্চদশ শতকের মধ্যে হেরাত ও কাবুল তৈমুরীয় সংস্কৃতির ঝলমলে কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যা শিল্প, সাহিত্য ও খাবারের জন্য বিখ্যাত ছিল। সেখানকার রাজকীয় বাবুর্চিরা কাবুলি পোলাও-এর মতো শাহী খাবার তৈরি করতেন, যেখানে চাল, ভেড়ার মাংস, গাজর, কিশমিশ, কাঠবাদাম ও এলাচ ব্যবহার করা হতো। এটি কেবল অভিজাত ও রাজকীয় ভোজের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
১৫০৪ সালে তৈমুরীয় রাজপুত্র বাবর যখন ফারগানা থেকে বিতাড়িত হয়ে কাবুলে আশ্রয় নেন, তখন তিনি মধ্য এশিয়া ও পারস্যের এই রন্ধন ঐতিহ্য সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ১৫২৬ সালে তিনি ভারতে এসে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে সেই স্বাদও ভারতে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে ভারতীয় বাসমতি চাল ও স্থানীয় মশলার সংমিশ্রণে এটি বিকশিত হতে থাকে।
বিরিয়ানি কি সবসময়ই ভারতীয় ছিল?
আরেকটি পৃথক তত্ত্ব অনুযায়ী, আরব ও পারস্যের ব্যবসায়ীদের নিয়ে আসা পোলাও জাতীয় খাবার থেকে মোগলদের হাত ধরেই বিরিয়ানির বিকাশ ঘটে। ধারণা করা হয়, সেনারা চালের সঙ্গে হাতের কাছে পাওয়া যে কোনও মাংস মিশিয়ে এক পাত্রে পেটভরে খাওয়ার মতো এই খাবার তৈরি করত।
তবে অষ্টাদশ শতকের আগে মোগল নথিপত্রে ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এই সময়ের মধ্যে এটি তার সাধারণ রূপ ছেড়ে দিল্লি, লখনউ এবং হায়দরাবাদের রাজপরিবারের অভিজাত খাবারে পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই প্রতিটি শহর নিজেদের মতো করে বিরিয়ানির স্বতন্ত্র শৈলী তৈরি করে নেয়।
মোগল নয়, দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সৃষ্টি?
চতুর্থ ও আরও পুরোনো একটি তত্ত্ব এই খাবারের ইতিহাসকে খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতকে বর্তমান তামিলনাড়ুতে নিয়ে যায়। প্রাচীন বিবরণে জানা যায়, যোদ্ধা ও সেনাদের শক্তির জন্য ঘি, গরুর মাংস, তেজপাতা ও গোলমরিচ দিয়ে চাল ও মাংসের একটি পদ তৈরি করা হতো।
লখনউ ও হায়দরাবাদে বিরিয়ানি শিল্পের চূড়ান্ত বিকাশ
সূচনা যেখানেই হোক না কেন, আওধ (লখনউ) ও হায়দরাবাদের রাজদরবারেই বিরিয়ানি তার প্রকৃত রূপ ও পরিচিতি পায়। সেখানকার বাবুর্চিরা বিরিয়ানিকে একটি শিল্পকলায় উন্নীত করেন। লখনউয়ের বিরিয়ানি প্রথাগতভাবে তামার পাত্রে সূক্ষ্ম ও সুবাসিত স্বাদে রান্না করা হয়, অন্যদিকে হায়দরাবাদি বিরিয়ানির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর জাফরানি স্বাদ ও ঘ্রাণ।
তাহলে বিরিয়ানির উৎপত্তি কি পারস্যে, রূপ পেয়েছে আফগানিস্তানে, নাকি ভারতের মাটিতে এটি পূর্ণতা পেয়েছে? কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশকে এর একক উদ্ভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন।
সূত্র: এনডিটিভি

মার্কিন অবরোধের মধ্যেও ১৮ বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির দাবি ইরানের
বড় লক্ষ্য অর্জনে কি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলির পাঁঠা বানালেন মোদি
‘ককরোচরা’ কি এবার রাজনৈতিক দল তৈরি করছে?





