প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অনাস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং তরুণদের ক্ষোভ-এই তিনের সংযোগে দেশে দেশে রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসছেন অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা ও ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররা। কেউ নির্বাচনে জিতে পার্লামেন্টে যাচ্ছেন, কেউ আন্দোলন সংগঠিত করছেন, আবার কেউ হয়ে উঠছেন জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
একসময় রাজনীতিতে পরিচিতি পেতে প্রয়োজন হতো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা, মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কাজ কিংবা সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত উপস্থিতি। এখন সেই পরিচিতি তৈরির একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ক্যামেরার সামনে কথা বলা, দুর্নীতি নিয়ে ভিডিও তৈরি, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা কিংবা সাধারণ মানুষের সমস্যা তুলে ধরার মধ্য দিয়েই অনেকে গড়ে তুলছেন বড় অনুসারী-গোষ্ঠী। পরে সেই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে কেউ সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন, কেউ হয়ে উঠছেন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক।
এই প্রবণতা রাতারাতি আসেনি। ইতালিতে কৌতুকশিল্পী বেপ্পে গ্রিলো ২০০০-এর দশকে ব্লগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট গড়েছিলেন। ২০০৮ সালে বারাক ওবামার প্রচারণায় ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখে। পরে টুইটার ও ফেসবুক ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের সরাসরি ভোটারের কাছে পৌঁছে দেয়। ইউটিউবে এর পরের ধাপ হলো নিজের চ্যানেলের দর্শককে সংগঠনে রূপ দেওয়া।
জনপ্রিয়তা যখন রাজনৈতিক পুঁজি
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা নতুন কোনও বিষয় নয়। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও সংগীতের তারকারা বহু আগেই রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা রোনাল্ড রিগ্যান ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর হওয়ার পর ১৯৮১ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। ইউক্রেনের অভিনেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে তাদের উত্থানের পথ এবং বর্তমান ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের উত্থান এক নয়।
জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয় যখন অনুসারীরা কেবল বিনোদন বা তথ্যের জন্য নয়, বরং কোনও রাজনৈতিক বিষয়ে অবস্থান জানতে, প্রতিবাদে অংশ নিতে কিংবা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে ওই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশে অনলাইন সংবাদ নির্মাতারা রাজনৈতিক মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হাঙ্গেরি, ভারত ও পেরুর উদাহরণে দেখা যায়, অনলাইন নির্মাতারা কখনও প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে, কখনও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে এবং কখনও ক্ষমতাসীনদের সমালোচক হিসেবে প্রভাব বিস্তার করছেন।
নেপালের ক্ষমতাভার গ্রহণ
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ ২৬টি প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করা হলে তরুণদের ক্ষোভ ফেটে পড়ে। সাবেক ডিজে সুদন গুরুং-এর সংগঠন হামি নেপাল ডিসকর্ড ও ইনস্টাগ্রামে ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত করে। সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন, সংসদ ভবনে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা এবং প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। যার ফলে কাঠমান্ডুর তৎকালীন মেয়র বালেন্দ্র শাহ এখন প্রধানমন্ত্রী।
ইউটিউবের জনপ্রিয়তা থেকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে
ডিজিটাল জনপ্রিয়তা সরাসরি নির্বাচনী সাফল্যে রূপ নেওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সাইপ্রাসের ফিদিয়াস পানাইয়োতু। ইউটিউবে মজার ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচিতি পান তিনি।
২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে মাত্র ২৪ বছর বয়সে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ১৯ শতাংশ ভোট পান ফিদিয়াস। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগে তার প্রচলিত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু অনলাইনে পরিচিতি, সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার ভাবমূর্তি তাকে অন্য প্রার্থীদের থেকে আলাদা করে তোলে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার জনপ্রিয়তা ভোটারদের কাছে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছে।
জাপানের নির্বাচনে প্রভাব
সুপারমার্কেট ম্যানেজার ও ইংরেজি শিক্ষক সোহেই কামিয়া কোভিড মহামারির সময় ইউটিউবে মানুষ জড়ো করতে শুরু করেন। ২০২০ সালে ইউটিউবে সমর্থকদের জড়ো করেই তিনি সানসেইতো দল গড়েন, পরে ধাপে ধাপে স্থানীয় পরিষদে আসন জেতেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের উচ্চকক্ষ নির্বাচনে দলটি আগের ১টি আসন থেকে বেড়ে ১৪টি আসন পায়। এনএইচকের জরিপে দলটি ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে। তবে দলটির বিদেশি-বিরোধী অবস্থানকে অনেকে বিদ্বেষমূলক বলে সমালোচনা করছেন।
আরেক উদাহরণ ইউটিউবার ইয়োশিকাজু হিগাশিতানি (গাসি)। তিনি ২০২২ সালে বিদেশে থেকেই প্রচারণা চালিয়ে উচ্চকক্ষে নির্বাচিত হন, কিন্তু একটি অধিবেশনেও যোগ না দেওয়ায় ২০২৩ সালে বহিষ্কৃত হন। অর্থাৎ জনপ্রিয়তা সব সময় শাসনক্ষমতায় রূপ নেয় না।
বাংলাদেশে এর প্রভাব
বাংলাদেশে ইউটিউবাররা এখনও প্রধানত রাজনৈতিক প্রভাবশালী, নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনোভিশন বাংলাদেশের এক জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও প্রায় ৫ শতাংশ ভোটারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। ঢাকা ট্রিবিউনের একটি মতামতে বলা হয়েছে, কিছু প্রভাবশালী ইউটিউবার আগে সাংবাদিক ছিলেন। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিলেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দল টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবে গান ও কনটেন্ট দিয়ে প্রচারণা চালায়।
কেন এত প্রভাব?
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত দল ও গণমাধ্যমের প্রতি অনাস্থা থাকলে মানুষ ইনফ্লুয়েনসারদের মতো একজনের কথায় বেশি ভরসা করে। জাপানের গবেষক একে বলেছেন, দলগুলো সরকারবিরোধী মনোভাবের পাত্র হয়ে উঠছে। এ ধরনের প্রচারে খরচ কম, মাঠে সংগঠন বা টিভি স্লটের দরকার নেই। একটি মোবাইল ও দর্শকই যথেষ্ট। দ্রুত আন্দোলনে তথ্য, ডাক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। নেপালে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভিপিএন ও ডিসকর্ড ব্যবহার করে আন্দোলন গতি বৃদ্ধি করা হয়।
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আটক