পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাশিয়া চীন, সৌদি আরব, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের দিকে ঝুঁকছে। দুই ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থনীতির দেশটি নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনে এসব দেশকে আহ্বান জানিয়েছে। যে শহরে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই সেন্ট পিটার্সবার্গ গড়ে তুলেছিলেন জার শাসকরা। তারা এটিকে ইউরোপের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে মনে করতেন।
ইউক্রেনের যুদ্ধ পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে সবচেয়ে বড় পতন ঘটিয়েছে। ১৯৬২ সালে কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর সম্পর্ক এত তলানিতে আরও কখনও যায়নি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে রুশ অর্থনৈতিক সংকটে বিরল বিপ্লব ঘটিয়েছে।
জার পিটার দ্য গ্রেট আধুনিক রাশিয়ার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং ১৮ শতকের শুরুতে সেন্ট পিটার্সবুর্গকে বানিয়েছিলেন রাজধানী। ওই সময় থেকেই রুশ শাসকরা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ধারণার জন্য পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী ছিলেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এশিয়া ও পশ্চিমাদের বাদ দিয়ে বাকি বিশ্বের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছেন। পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞাকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কার্যালয় ক্রেমলিন যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির ইউরোপীয় মিত্রদের জারি করা অর্থনৈতিক অবরোধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাশিয়ার অর্থনীতিকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করতে পারেনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এর ফলে চীনসহ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে।
এই দেশগুলো রুশ অর্থনীতিতে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, তা স্পষ্ট নয়। কিংবা এই বিনিয়োগের বিনিময়ে রাশিয়া তাদের দেবে, তাও জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত সম্মেলন থেকে কোনও বড় ধরনের সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
কিন্তু রুশ কর্মকর্তারা বলছেন, এটি মাত্র শুরু। পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক আগামী এক প্রজন্মের জন্য বাতিলের খাতায় চলে গেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের প্রধান অধিবেশনে পুতিনের সঙ্গে যোগ দেবেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট লুইস আরকে। তিনি বলেছেন, বড় একটি অর্থনীতির সঙ্গে বলিভিয়ার নতুন অর্থনৈতিক মডেলের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে চাইছিলেন।
পুতিনকে তিনি বলেছেন, আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক মডেল রয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আমরা এই অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে চাই।
জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট এমারসন মানঙ্গাগওয়া সম্মেলনে উপস্থিত হবেন। এছাড়া সৌদি আরবের তেলমন্ত্রী, ওমানের বাণিজ্যমন্ত্রী, একজন সিনিয়র তালেবান কর্মকর্তাসহ ৪৫ জন বিদেশি কর্মকর্তা এতে উপস্থিত হবেন।
জিম্বাবুয়ের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য খুব বেশি নয়। ২০২৩ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৬৮ বিলিয়ন ডলার। ইউক্রেনের হামলার পূর্ব পর্যন্ত ওই বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য ছিল ৩০০ বিলিয়ন ডলারের।
অতীতে রাশিয়ার বিস্তৃত খনিজ সম্পদ ও ইউরোপের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে ভাগ বসাতে পশ্চিমা বিনিয়োগকারী ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারদের এই ফোরামে উপস্থিতি ছিল দলে দলে। কিন্তু রয়টার্স এবারের ফোরামে বড় কোনও পশ্চিমা কোম্পানিকে দেখতে পায়নি।
১৯৯০ দশকের আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হওয়া রুশ ধনকুবেররাও অনেকটাই বিলুপ্ত। পুতিনের রাশিয়ায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হয় শীতল যুদ্ধের সময়কার গুপ্তচর ও টেকনোক্র্যাটদের দ্বারা।
এবারের সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত স্বেয়ার ব্যাংকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সঙ্গে আছেন তেল জায়ান্টা গ্যাজপ্রমসহ রাশিয়ার আঞ্চলিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
এই বছর ফোরামের প্রতিপাদ্য হলো: বহুমুখী বিশ্বের ভিত্তি হলো প্রবৃদ্ধির নতুন বিন্দু গড়ে তোলা।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রুশ অর্থনীতি সহনশীলতার প্রমাণ দেখিয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রত্যক্ষ করছে রুশরা।
ডলারের নিরিখে এক দশকের আগের মতোই আকার রুশ অর্থনীতির। রাশিয়ার চেয়ে অন্তত ২৫ গুণ বড় পশ্চিমা অর্থনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন পুতিন।
ফোরামে উপস্থিত হওয়া অনেক বিদেশি রাশিয়ার প্রশংসা করছেন। নাইজেরিয়ার এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এই বছরের আয়োজনের ব্যাপ্তি বেড়েছে। অনেক সুযোগ রয়েছে। পশ্চিমারা হয়ত নিজেদেরকেই বিচ্ছিন্ন করছে। বিশ্বে তারা সংখ্যালঘু। যদিও বিশ্বের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারা। বিশ্বের অপর অংশের সঙ্গে সহযোগিতায় থাকা সব সময় ভালো।
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অপর দেশগুলোর কর্মকর্তাদের কণ্ঠেও একই সুর। সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান পুতিনের জ্বালানি বিষয়ক কর্মকর্তা ও ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাকের সঙ্গে ফোরামে বৈঠক করেছেন।
নোভাক বলেছেন, বন্ধু সুলভ দেশগুলো যে বিপুল পরিমাণ তেলে কিনেছে সেগুলোর ৭০ শতাংশ তারা নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বন্ধু সুলভ দেশগুলোতে ৯৫ শতাংশ তেল ও পেট্রোলজাত পণ্য সরবরাহ করেছি।
সূত্র: রয়টার্স








