কুরস্কে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও, এই অভিযান চালাতে দেশটিকে বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে। আকস্মিক আক্রমণের পর দ্রুতই ইউক্রেন রাশিয়ার ৩০ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছে গেলেও এরপর থেকে তাদের অগ্রগতি মন্থর হতে থাকে। সম্প্রতি রাশিয়া পাল্টা হামলা শুরু করেছে। সেখানকার লড়াইয়ে অংশ নেওয়া কয়েকজন ইউক্রেনীয় সেনার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থতি এবং ইউক্রেনের সফলতা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
ইউক্রেনের সেনা ভাসিল যখন রাশিয়ার অভ্যন্তরে কয়েক মাইল ঢুকে গেছেন, তখন তিনি শুনলেন একটি ড্রোনের শব্দ, যা বোমায় পূর্ণ ছিল। প্রতিক্রিয়া দেখানো জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড ছিল তার। তিনি বলেন, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছিল। আমরা গাছের নিচে দৌড়ে আশ্রয় নিই এবং মাত্র এক বা দুই মিটার দূরে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। ভাসিল এখন ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় সুমি শহরে আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গত মাসে ইউক্রেন কৌশলগতভাবে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। দ্রুতই প্রায় ৩০ কিলোমিটার এগিয়ে যায় তারা। কিন্তু এই অভিযানটির ধীর হয়ে আসে এবং গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, রাশিয়া পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রুশ বাহিনী কুরস্ক অঞ্চলে ১০টি স্থাপনা পুনরুদ্ধার করেছে।
এই পাল্টা আক্রমণের আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ৫টি ইউনিটের ১৪ জন ইউক্রেনীয় সেনার সঙ্গে কথা বলেছে, যারা এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন আহত ও বর্তমানে ইউক্রেনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাকিরা এখনও রাশিয়ায় অভিযান পরিচালনা করছেন। সেনাদের মধ্যে কেউ ড্রোন ইউনিটের, কেউ সাঁজোয়া যান চালক, আবার কেউ ফ্রন্টলাইন ইঞ্জিনিয়ার।
সেনারা সবাই কুরস্কে এই অভিযানের কষ্টসাধ্য দিকগুলো উল্লেখ করেন। তাদের মতে, রাশিয়া প্রচুর সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র কুরস্কে পাঠাচ্ছে। তারা জানান, রাশিয়া ৩০ হাজারেরও বেশি সেনা কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। কিছু ইউক্রেনীয় সেনা দাবি করেছেন, রাশিয়ার নিয়মিত বাহিনীর তুলনায় ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধাদের সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ অনেক ভালো। চেচেন নেতা রামজান কাদিরভও দাবি করেছেন, তার বিশেষ বাহিনীও কুরস্কে রয়েছে।
যদিও রাশিয়া কয়েকটি ছোট স্থাপনা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, তবে যুদ্ধ বিশ্লেষণ সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার-এর মতে, ইউক্রেন এখনও অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। যা ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে এটি এক বড় মানসিক বিজয়, যেহেতু কিয়েভ প্রথমবারের মতো কৌশলগতভাবে এত বড় সাফল্য পেয়েছে।
ভাসিল জানান, রাশিয়া বিশাল এক দেশ, আর তারা পারমাণবিক শক্তিধর। কিন্তু আমরা দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে আমরা এখনও তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি। আমরা বিশ্বকে বলছি, সাহসী হতে হবে, শক্ত হতে হবে।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কি সিএনএন-কে বলেছিলেন, কুরস্ক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে নতুন আক্রমণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অঞ্চলটিকে ব্যবহার থেকে বিরত রাখা, তাদের মনোযোগ অন্য ফ্রন্ট থেকে সরানো এবং ইউক্রেনের সামরিক মনোবল বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ পরিচালক বিল বার্নস এটিকে একটি ‘কৌশলগত অর্জন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল ইউক্রেনের মনোবল বাড়িয়েছে তা নয়, রাশিয়ার দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
কুরস্ক অভিযান সফল হলেও এটি একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। কিছু সেনা জানান, রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সেনাদের মধ্যে ক্লান্তি ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সেনাদের একাংশ বলেন, তারা পুরোপুরি অবসন্ন হয়ে পড়েছেন এবং মিশন চালিয়ে যেতে তাদের জন্য তা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের সময় যোগাযোগের সমস্যা ও স্থলপথের চ্যালেঞ্জগুলো সেনাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। সাঁজোয়া যান চালকরা জানান, দুর্বল দৃশ্যমানতা ও যোগাযোগ সংকটের কারণে রাশিয়ার অচেনা ভূখণ্ডে তাদের দিকনির্দেশনায় ভুল হয়েছে। এক সেনা বলেছেন, আমরা ভুল জায়গায় গিয়ে আটকে পড়েছিলাম এবং আমাদের কমান্ডারের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।
যুদ্ধের দিনগুলোতে মাইন পরিষ্কার করা এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ছিল বলে সেনারা জানিয়েছেন। এক সেনা বলেন, এটি সহজ হলে এখানে এত অ্যাম্বুলেন্স দেখতেন না। মিশনের প্রাথমিক সময়ে তারা রাশিয়ার মাইন পরিষ্কার করছিলেন, এখন তারা নিজেরাই মাইন পুঁতছেন রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য।
ভাসিল বললেন, যুদ্ধ চলছে, আমরা সেনা এবং আমাদের কাজ আমাদের দেশকে রক্ষা করা। এটা এক বড় পরিকল্পনার অংশ এবং আমি প্রশ্ন করিনি কেন আমি এখানে আছি।
যুদ্ধের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ভাসিল ও তার কমান্ডার খোলদ তাদের সাহস ধরে রেখেছেন। তিনি বলেন, যখন আপনি খুব ভীত, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা। আপনি যদি আপনার ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।








