গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুমকির মধ্যে স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ডটিতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ডেনমার্ক। উত্তেজনা বাড়তে থাকায় আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারের এই পদক্ষেপ নিয়েছে কোপেনহেগেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
ডেনমার্কের গণমাধ্যম ডিআর ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের কাংগারলুসুয়াকে পৌঁছান রয়্যাল ড্যানিশ আর্মির প্রধান পিটার বয়েসেন। তার সঙ্গে ছিলেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভি২ জানায়, এ দফায় ৫৮ জন ডেনিশ সেনা আর্কটিক অঞ্চলে অবতরণ করেছেন। তারা আগেই পাঠানো প্রায় ৬০ জন সেনার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। এই সেনারা বহুজাতিক সামরিক মহড়া ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’-এ অংশ নিচ্ছেন।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি। তবে সেনা মোতায়েনের সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানান। সোমবার এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেন, ‘নো কমেন্ট’।
এর আগে, চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প শনিবার নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরেকে পাঠানো এক বার্তায় বলেন, তিনি আর কেবল ‘শান্তির কথা ভেবে চলতে বাধ্য’ বোধ করছেন না। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যাবশ্যক’ বলে দাবি করে আসছেন ট্রাম্প।
ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে খোলামেলা মনোভাব দেখালেও বারবার বলেছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। ডেনিশ সরকারের মতে, শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখলের যেকোনও চেষ্টা ন্যাটোর অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে। কারণ, ন্যাটোর সনদের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জোটের কোনও এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা মানে তা সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক দুটিই রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচু পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এতে ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তা জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পুলসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আর্কটিক নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে ডেনিশ ভূখণ্ডে যৌথ ন্যাটো মিশন গঠনের বিষয়টিও রয়েছে। বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে রুটে বলেন, আর্কটিক অঞ্চল আমাদের সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এ অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে কোপেনহেগেনের বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মিত্র দেশগুলো হিসেবে আমরা একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাব।
ডেনিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পুলসেন আলোচনার পর ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের মিত্রদের ধন্যবাদ।
নিরাপত্তা উত্তেজনার পাশাপাশি বাণিজ্য ক্ষেত্রেও সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ডেনমার্কসহ ইউরোপের সাতটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এতে পূর্ণমাত্রার ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং ইইউর অ্যান্টি-কোয়ারশন মেকানিজম সক্রিয় করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ট্রেড বাজুকা নামে পরিচিত এই ব্যবস্থাটি চালু হলে, একক বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে ইইউ।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সোমবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ‘নিঃসন্দেহে সম্মান করার প্রয়োজনীয়তা’ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, ডেনমার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা স্বার্থ এগিয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থানও স্পষ্ট। ডেনিশ দৈনিক বেরলিংস্কের কমিশনে গত বছর করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। মাত্র ৬ শতাংশ এ বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছেন।









