রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

ফ্রন্ট লাইনে ক্লান্ত ইউক্রেনীয় সেনারা, শান্তি আলোচনা যেন মরীচিকা

রাইনা সিদ্দিকী
১৮ মার্চ ২০২৬, ২৩:১৪আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ২৩:১৪

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পা রেখেছে চতুর্থ বছরে। এই দীর্ঘ সময়ে যুদ্ধের মানচিত্র যেমন বদলেছে, তেমনি বদলে গেছে মানুষের মনস্তত্ত্ব আর রণকৌশল। এক ভয়াবহ বাস্তবতায় এখন দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেনীয় বাহিনী, রণাঙ্গণে সেনাদের চরম ক্লান্তি, প্রযুক্তির দাপট আর শান্তি আলোচনার মরীচিকা মিলেমিশে একাকার।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক কোস্তিয়ান্টিন হনচারভ যুদ্ধের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,  আমি এখনও বুঝতে পারছি না কেন এই যুদ্ধ শুরু হলো, কেন চলছে এবং কখন, কী মূল্যে এটি শেষ হবে।

হনচারভের কাছে মৃত্যু এখন প্রাত্যহিক রুটিন। ২০২৩ সালের শীতে আহত হয়ে রণক্ষেত্র থেকে সরে আসার সময় তার ৩০ সদস্যের প্লাটুনের মাত্র পাঁচজন টিকে ছিলেন। বাকি সবাই হয় নিহত, না হয় চিরতরে পঙ্গু। তিনি জানান, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সংকট এখন চরম ক্লান্তি। ফ্রন্ট লাইনের ইউনিটগুলোকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। পদাতিক বাহিনীর তীব্র সংকটে এখন রাঁধুনি, গাড়িচালক এমনকি বিমান বিধ্বংসী ইউনিটের সদস্যদেরও ফ্রন্টে পাঠানো হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে তারা হয় মারা যাচ্ছে, নয়তো রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাচ্ছে।

হনচারভ সতর্ক করে বলেন, একজন পদাতিক সেনা যদি টানা ৬০ দিন ফ্রন্টে থাকে, তবে সে আর কার্যকরী যোদ্ধা থাকে না। এই চাপ মানুষকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ফ্রন্ট লাইনে ক্লান্ত ইউক্রেনীয় সেনারা, শান্তি আলোচনা যেন মরীচিকা

চতুর্থ বছরে এসে যুদ্ধটি পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এখন ফ্রন্ট লাইনে সেনা প্রতিস্থাপন করতে হলে মাইলের পর মাইল ‘ডেথ জোন’ পাড়ি দিতে হয়, যেখানে সারাক্ষণ ওড়ে ঘাতক ড্রোন।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের এই ড্রোন যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানের তৈরি ড্রোনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের উদ্ভাবিত ‘ড্রোন ইন্টারসেপ্টর’ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের সহায়তা চাইছে।

দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন ড্রোন বিক্রি নিয়ন্ত্রণে নতুন কঠোর ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশি কোনও প্রতিষ্ঠান যেন সরকারকে বাইপাস করে সরাসরি নির্মাতাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারে। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছে।

এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রকট হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াকেই সবচেয়ে বড় ‘বিজয়ী’ হিসেবে দেখছেন।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যাতে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ায় পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাতে পারে। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জেলেনস্কি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল পরিবহনের অনুমতি দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে বলা যায় না যে তারা যেন নিষেধাজ্ঞা না তোলে?

রণক্ষেত্রে সামনের সারিতে থাকা সেনাদের কাছে ‘শান্তি আলোচনা’ শব্দ দুটি কেবলই বিভ্রম। হনচারভ লিখেছেন, পেছনের মানুষের কাছে আলোচনার খবরে মনে হয় যুদ্ধ শেষের পথে। কিন্তু আমাদের কাছে কিছুই বদলায় না। কামান দাগে, ড্রোন ওড়ে, মানুষ মরে।

জেলেনস্কি পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন ও মস্কোর দিকে তাকিয়ে আছেন। যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। জেলেনস্কি বলেন, আমরা এখন মার্কিনীদের কাছ থেকে জবাবের অপেক্ষায় আছি।

যুদ্ধের ১ হাজার ৪৮২তম পেরিয়ে ইউক্রেনের অবস্থান ক্রমশ কঠিনতর হচ্ছে। একদিকে সেনা সংকট, অন্যদিকে ড্রোন প্রযুক্তির নতুন দফার লড়াই। অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘মি. নোবডি অ্যাগেইনস্ট পুতিন’ রাশিয়ার ভেতরে চলমান নীরব প্রতিরোধের গল্প বললেও, রণক্ষেত্রের বাস্তবতা ভিন্ন। হনচারভ তার বক্তব্য শেষ করেছেন এক বুক হাহাকার নিয়ে। তিনি বলেন, আমি সত্যিই চাই আমি ভুল প্রমাণিত হই। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লড়াই আরও অনেক দিন চলবে।

সূত্র: ডিডব্লিউ, আল জাজিরা, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান

/এএ/
সম্পর্কিত
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কি এখন দুই পথের পথিক?
নিউ জিল্যান্ডের চার এমপির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা
মদ্যপ স্বামীকে পিটিয়ে হত্যার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর আত্মসমর্পণ
সর্বশেষ খবর
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ডে নির্মিত ফ্লোটিং ক্রেন যুক্ত হলো নৌবহরে
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
জিয়াউর রহমানের আদর্শ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়: আইনমন্ত্রী
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
রেললাইনে আটকে গেলো মাইক্রোবাস, ট্রেনের ধাক্কায় পুকুরে
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে:  প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
দেশীয় খামারিদের পশুতেই শতভাগ কোরবানি হয়েছে: প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের