অভিবাসন কমলেও কেন শান্ত হচ্ছে না ব্রিটেন

মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
১৫ জুন ২০২৬, ২২:৪৬আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ২২:৪৬

ব্রিটেনে অভিবাসীদের মোট আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কারণে জনমনে উদ্বেগ কেন গভীর হচ্ছে এবং কেন বেলফাস্টের ঘটনায় অভিবাসী কমিউনিটি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? গত কয়েক দশক ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির অলক্ষ্যে জনমনে এক ধরনের অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। এর মূলে রয়েছে একটি সাধারণ ধারণা যে, ওয়েস্টমিনস্টার থেকে চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক রূপরেখা বাস্তবের মাটির সঙ্গে মিলছে না। এখন সেই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে; জনমিতির পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সক্ষমতার প্রকৃত মূল্য কতটুকু, তা নিয়ে আজ গভীর দ্বন্দ্বে বিভক্ত এক জাতি।

যুক্তরাজ্যের জন্য এই সংঘাতটি এমন এক অদ্ভুত সময়ে এসেছে যখন অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস)-এর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক নেট অভিবাসন প্রায় অর্ধেক কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার। কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কারণে ইইউ-বহির্ভূত দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা কমেছে, যার প্রধান কারণ সরকারের কঠোর ভিসা নীতি এবং নির্দিষ্ট কিছু কেয়ার ওয়ার্কার রুট বন্ধ করে দেওয়া।

তবুও, পরিসংখ্যানের এই নাটকীয় পতন জনমানসের উদ্বেগ প্রশমিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো জাতীয় জনমত জরিপ নির্দেশ করছে যে, অভিবাসন আবার ব্রিটিশদের উদ্বেগের একেবারে শীর্ষে চলে এসেছে; ৪১ শতাংশ নাগরিক এটিকে দেশের প্রধান সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জনমতের ওপর চালানো একটি গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই উত্তেজনার কারণ এখন আর শুধু কত মানুষ আসছে সেই সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ওপর ক্রমহ্রাসমান আস্থা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার চরম অভাব।

অসন্তোষের নেপথ্য উপাদান

সংখ্যা কমলেও জনসাধারণের ক্ষোভ কেন এত চড়া, তা বুঝতে এই মানসিকতার পেছনের উপাদানগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। স্বতন্ত্র তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করছে যে, দুই-তৃতীয়াংশ ব্রিটিশ নাগরিক এখনও মনে করেন সামগ্রিক অভিবাসনের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে তাদের মূল উদ্বেগ অর্থনৈতিক বা স্টুডেন্ট ভিসার চেয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর বেশি কেন্দ্রীভূত।

এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কী কাজ করছে জানতে চাওয়া হলে নাগরিকরা সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলেন। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশ মনে করেন দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণই এর প্রধান কারণ, আর ৫৯ শতাংশ তাদের উদ্বেগের জন্য রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক সুবিধার সহজলভ্যতাকে দায়ী করেন। এই ধারণাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যমান নানামুখী সংকট: ৬১ শতাংশ মানুষ সরাসরি জানিয়েছেন যে অভিবাসনের কারণে আবাসন সমস্যা তীব্র হয়েছে, এবং অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মনে করেন এটি স্থানীয় জনসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানের সময় এক জনসেবা কর্মী বলেন, স্প্রেডশিটের ভেতরের সংখ্যাগুলো কোনও জিপি (ডাক্তার) অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া কিংবা আমাদের এলাকায় একটি সাশ্রয়ী বাড়ি খোঁজার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। আমাদের মনে হচ্ছে সামাজিক চুক্তিটি আজ ভেঙে পড়ছে, কারণ অবকাঠামো উন্নয়নের গতির চেয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি অনেক বেশি।

আস্থার সংকট ও রাজনৈতিক শূন্যতা

জনসাধারণের এই হতাশার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক শ্রেণির ওপর আস্থার তীব্র সংকট। ব্রিটেনের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের দেশের কোনও মূলধারার বড় ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের ওপর আস্থা নেই যে তারা অভিবাসন নীতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এই শূন্যতা ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থার কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং একই সঙ্গে কঠোর সীমান্ত নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিকল্প রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনসমর্থন অভূতপূর্বভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

জনসাধারণের এই বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ মেলে আরেকটি শান্ত অথচ স্থায়ী প্রবণতায়: খোদ ব্রিটিশ নাগরিকদেরই দেশ ছাড়ার হার। অর্থনৈতিক হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে, ২০২৫ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৩৬ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক উন্নত জীবনের আশায় নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

ভবিষ্যতের পূর্বাভাস ও বাস্তবতা

২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিতর্ক একটি অস্থিতিশীল নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান প্রশাসন সুনির্দিষ্ট কোনও সংখ্যাত্মক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিরোধিতা করলেও, সোচ্চার ভোটারদের চাপ সরকারকে খুব শিগগিরই আরও কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে। নীতি বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিথিলতার যে ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে তা ঠেকাতে সরকার চলতি বছরের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ফ্যামিলি ভিসার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম প্রবর্তন করতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলো কেবল কমতে থাকা পরিসংখ্যানের ওপর ভর করে জনক্ষোভ সামাল দিতে পারছে না। যতক্ষণ না আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সীমান্ত সুরক্ষার মৌলিক সংকটগুলোর দৃশ্যমান সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ ব্রিটেনের বহুসংস্কৃতির মডেলটিকে টিকিয়ে রাখা সামাজিক ঐকমত্য এক ঐতিহাসিক ও ভঙ্গুর চাপের মুখ থেকে বেরুতে পারবে না। ‘অভিবাসীরা সব সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে’, এটা যেমন অসত্য, তেমনি আশ্রয়প্রার্থীরা ব্রিটেনে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কোনও কাজ না করে জীবন যাপন করছে—যে জীবন সাধারণ মানুষ ফুলটাইম কাজ করেও পাচ্ছে না—এটাও সত্য এবং নিরেট বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়েই উগ্র ডানপন্থি রাজনীতি এগিয়ে যাচ্ছে।

 

/এএ/
সম্পর্কিত
ট্রায়ালে বোল্টের রেকর্ড ভাঙলো চীনের ‘লাইটনিং’
সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার নেপথ্যে কী, জানালেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
দুই ভাইয়ের গান, রেকর্ডিংয়ের এক যুগ পর প্রকাশ
দুই ভাইয়ের গান, রেকর্ডিংয়ের এক যুগ পর প্রকাশ
গ্যাস সংকটে ৩০০ কারখানা বন্ধ, প্রায় দুই মিলিয়ন ক্ষতি, পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে: বিকেএমইএ সভাপতি
গ্যাস সংকটে ৩০০ কারখানা বন্ধ, প্রায় দুই মিলিয়ন ক্ষতি, পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে: বিকেএমইএ সভাপতি
তেজগাঁও ও পল্টন মডেল থানার ওসি প্রত্যাহার
তেজগাঁও ও পল্টন মডেল থানার ওসি প্রত্যাহার
ঢাকার ৪১৬ বছর: চলচ্চিত্রের অর্ধশতাধিক গুণীজনকে সম্মাননা
ঢাকার ৪১৬ বছর: চলচ্চিত্রের অর্ধশতাধিক গুণীজনকে সম্মাননা
সর্বাধিক পঠিত
এক মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী?
এক মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী?
মধ্যরাতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যা লিখলেন প্রধানমন্ত্রী
মধ্যরাতে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যা লিখলেন প্রধানমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা