তীব্র ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে পুরো পশ্চিম ইউরোপ। ২০০৩ সালের স্মরণীয় সেই তাপদাহে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর দুই দশক কেটে গেলেও ইউরোপে গরমজনিত মৃত্যুর মিছিল থামেনি। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই স্পেনে মাত্র চার দিনে ২১০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। ফ্রান্সেও একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে; রবিবার বাইরে কাজ করার সময় এক বৃদ্ধ মারা যান, পরদিন একটি তপ্ত গাড়ির ভেতর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় দুই শিশু। এমনকি গত বুধবার ৩ বছর বয়সী এক শিশু রোদের মধ্যে উত্তপ্ত গাড়িতে লুকিয়ে থাকতে গিয়ে প্রাণ হারায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, গত চার বছরে ইউরোপে তীব্র গরমে ২ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২২ সালেও এই সংখ্যা ছিল ৬০ হাজারের ওপরে। অথচ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশের বাস ইউরোপে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে গরমজনিত মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশই ঘটে এই মহাদেশে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রা কাজমিয়ারচাক একে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ একদিকে ইউরোপের জলবায়ু দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে, অন্যদিকে এই মহাদেশের জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বয়োবৃদ্ধ হয়ে পড়ছে। বয়স্ক ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই এই গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তবে শুধু বয়সই একমাত্র কারণ নয়, ইউরোপের ঘরবাড়িগুলোও এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরোয়েন ক্লুক জানান, ইউরোপের শহর ও বাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছিল আগের আমলের ঠান্ডা জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের বাড়িগুলো শীতকালে ভেতরে তাপ ধরে রাখার জন্য তৈরি, যা গ্রীষ্মে এসে মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্যারিসের বিখ্যাত জিঙ্কের ছাদগুলো তীব্র গরমে পুরো অ্যাপার্টমেন্টকে একেকটি ওভেনে রূপান্তরিত করছে।
এর ওপর ইউরোপে এসির ব্যবহার খুবই সীমিত। আমেরিকার ৯০ শতাংশ বাড়িতে এসি থাকলেও ইউরোপে এই হার মাত্র ২০ শতাংশ। রেড ক্রসের জলবায়ু কেন্দ্রের প্রতিনিধি ফ্লেয়ার মোনাসো বলেন, ইউরোপে এসির আওতা অনেক কম, অথচ এটি জীবন রক্ষাকারী একটি মাধ্যম।
শুধু ঘরবাড়ি নয়; স্কুল, হাসপাতাল ও কারখানায় পর্যাপ্ত কুলিং সিস্টেম না থাকায় ২০০০ সালের পর থেকে ইউরোপের কর্মক্ষেত্রে গরমজনিত মৃত্যুর হার ৪২ শতাংশ বেড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে তীব্র গরমের কারণে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এসি না থাকায় বেলজিয়ামে ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে রুম অতিরিক্ত গরম হয়ে এক রোগীর মৃত্যুও হয়েছে।
ডব্লিউএইচও’র আঞ্চলিক পরিচালক হ্যান্স ক্লুগ বলেন, ইউরোপের বড় অংশই এই নিয়মিত সংকটের জন্য পদ্ধতিগতভাবে প্রস্তুত নয়। আমরা এখনও চরম গরমকে একটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য হুমকির বদলে স্রেফ আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছি।
পরিবেশবাদীরা এখন কৃত্রিম কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছেন। ফ্রঁস গ্রিনসের নেতা মারিন তোনদেলিয়ে বলেন, এমন কিছু জায়গা তৈরি হয়েছে যেখানে এসি ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৩ সালের আবহাওয়াকে মাথায় রেখে যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এখন তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখন কেবল জরুরি কাগজের পরিকল্পনা নয়; বরং শহর সবুজ করা, কাজের সময় পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মাধ্যমে ইউরোপের মানুষকে বাঁচানোর এখনই সময়।
সূত্র: পলিটিকো

সিলিকন ভ্যালির পর কোনখাতে জোয়ার আনবে এআই
চিকিৎসায় যুগান্তকারী আবিষ্কার হচ্ছে, কিন্তু রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন
ইউরোপজুড়ে নজিরবিহীন দাবদাহ, হাসপাতালগুলোতে সতর্কতা
তীব্র গরমেও ইউরোপে কেন এসি এত বিরল







