যে বাড়িতে নোয়াখালীর শান্তি ফেরাতে স্বাধীনতার দিন কাটিয়েছিলেন গান্ধী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:১৮ আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:১৮

কলকাতা মানেই নস্টালজিয়া, আর সেই নস্টালজিয়ার ভারী অনুভূতির কথা আজও মনে করেন একসময়ের বেলেঘাটার ঐতিহাসিক ‘হায়দারি মনজিল’-এর বংশোদ্ভূত আকিল বুসরাই, যা বর্তমানে গান্ধী ভবন নামে পরিচিত। গ্রিক আমলের পিলার, চারপাশের ঘর ও বিশাল জানালা সংবলিত চার থেকে পাঁচ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই বাগানবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ১৯৪৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের উত্তাল এক ইতিহাস। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় মহাত্মা গান্ধী এই বাড়িতেই অবস্থান করেছিলেন।

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পর থেকেই সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রক্তে ভিজেছিল কলকাতা। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশেও ছড়িয়ে পড়েছিল সেই হিংসার আগুন। তৎকালীন অখণ্ড বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নোয়াখালীর পরিবর্তে গান্ধীকে কলকাতায় থেকে শান্তি ফেরানোর অনুরোধ জানান। নোয়াখালীতে শান্তি ফেরানোর সেই ‘অলৌকিক’ সাফল্যের কথা মাথায় রেখেই গান্ধী শর্তসাপেক্ষে সেই অনুরোধে রাজি হন।

১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট সোদপুর আশ্রম থেকে একটি ভাঙাচোরা শেভ্রলে গাড়িতে চেপে বেলেঘাটায় পৌঁছান ৭৭ বছর বয়সী গান্ধী। কিন্তু তার এই আগমন সহজ ছিল না। কালো পতাকা ও পাথর হাতে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ঘিরে ধরে স্লোগান দেয়- ‘হিন্দুদের বাঁচান’, ‘গাছের ছায়ায় নয়, নোয়াখালীতে যান’ এবং ‘হিন্দুদের শত্রু’। তবে লাঠিসোঁটা বা পাথরের তোয়াক্কা না করে একাই সেই উন্মত্ত জনতার মুখোমুখি হন গান্ধী। তিনি শান্তভাবে জানান, কলকাতার বেলেঘাটায় তার উপস্থিতি নোয়াখালীর হিন্দুদেরও নিরাপদ রাখতে সাহায্য করছে।

জনতার মুখোমুখি হয়ে গান্ধী নিজেকে তাদের সুরক্ষায় সঁপে দেন। এমনকি কলকাতা যদি আবারও হিংসার আগুনে মেতে ওঠে, তবে তিনি বেঁচে থাকবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন। সেই সময় হায়দারি মনজিলের অবস্থা ছিল বেশ জরাজীর্ণ। দরজা-জানালা ভাঙা এবং শৌচাগারের অপ্রতুলতার মধ্যেও স্বেচ্ছাসেবক ও পরিবেষ্টিত মানুষের ভিড়ে শুরু হয় গান্ধীর নতুন অধ্যায়।

সকাল সাড়ে তিনটে বা চারটায় ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘর নিজেই ঝাড়ু দেওয়া, সকালের হাঁটা, দেশ-বিদেশ থেকে আসা রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করা- এভাবেই কাটত তার দিনগুলো। ১৪ আগস্ট স্বাধীনতার আগের দিন শেষ জনসভায় তিনি বলেন, ‘আগামীকাল আমরা ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত হব, তবে একই সঙ্গে ভারত বিভক্তও হবে’। স্বাধীনতার আনন্দ ও দেশভাগের বেদনার এই ক্ষণে তিনি রক্তপাত এড়িয়ে চরকা কাটা, প্রার্থনা ও উপবাসের ডাক দেন।

১৫ আগস্ট যখন গোটা দেশ স্বাধীনতা উদযাপন করছে, তখন কলকাতায় এই মুসলিমপ্রধান এলাকায় অলৌকিক এক পরিবর্তন ঘটে। হিংসা থেমে যায়, হিন্দু-মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তেরঙা পতাকা ওড়ায় এবং ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম গভর্নর সি. রাজাগোপলাচারী বলেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী তার জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছেন, তবে কলকাতার এই অর্জন তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

আজ হায়দরি মনজিল সংস্কারের পর ‘গান্ধী ভবন’ নামে পরিচিত হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই বাড়িটি এক অনন্য ও অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে রয়েছে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

/এএস/ 
সম্পর্কিত
পানির নিচে একসঙ্গে ১১৬ ড্রোন চালিয়ে চীনের নতুন বিশ্বরেকর্ড
ইরানের নেতৃত্বে ফাটল: গালিবাফকে নিয়ে লেখায় কট্টরপন্থি এমপি কারাগারে
ইনস্টাগ্রাম রিল-টেলিগ্রাম থেকে জালনোট তৈরির কৌশল, গ্রেফতার সবজি বিক্রেতা
সর্বশেষ খবর
কাটা আপেল কালচে হওয়া ঠেকাতে ঘরোয়া কৌশল
কাটা আপেল কালচে হওয়া ঠেকাতে ঘরোয়া কৌশল
বেবিচকের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত কমিটি
বেবিচকের দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তদন্ত কমিটি
একাধিক অনলাইন জুয়া সাইটের পরিচালক ও এজেন্ট গ্রেফতার
একাধিক অনলাইন জুয়া সাইটের পরিচালক ও এজেন্ট গ্রেফতার
বিদেশি পর্যটকদের জন্যও বিনামূল্যে ইংল্যান্ডের জাতীয় জাদুঘর
বিদেশি পর্যটকদের জন্যও বিনামূল্যে ইংল্যান্ডের জাতীয় জাদুঘর
সর্বাধিক পঠিত
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলা উচ্চারণ’ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য, স্কুলশিক্ষক আটক
প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলা উচ্চারণ’ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য, স্কুলশিক্ষক আটক
সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে যা বললেন বাণিজ্যমন্ত্রী
সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে যা বললেন বাণিজ্যমন্ত্রী
বিবি না সিসি ক্রিম ত্বকের জন্য কোনটি বেশি উপযোগী?
বিবি না সিসি ক্রিম ত্বকের জন্য কোনটি বেশি উপযোগী?