ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুক্রবার (২৫ জুলাই) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হামাস আলোচনায় আগ্রহী নয়, তাই বিকল্প পথে হাঁটার সময় এসেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাসের শাসনের অবসান ও জিম্মিদের ঘরে ফেরানো—এই দুই লক্ষ্য অর্জনে আমরা এখন বিকল্প পথ খুঁজছি। ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, হামাস নেতারা এখন থেকে শিকারে পরিণত হবেন।
এই মন্তব্যগুলোর ফলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম নজির গড়েছে। তবে ব্রিটেন ও জার্মানি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা এখনই এমন কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এর আগে কাতারে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বৃহস্পতিবার তাদের প্রতিনিধি দল প্রত্যাহার করে। ওই সময় বলা হয়েছিল, এটি শুধু পরামর্শের জন্য সাময়িক বিরতি। কিন্তু নেতানিয়াহুর মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ইসরায়েলের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ অভিযোগ করেছেন, আলোচনার অচলাবস্থার জন্য দায়ী হামাস। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাইম বলেছেন, আমরা প্রস্তাব যা করেছি তা পরিস্থিতির জটিলতা বুঝে। শত্রু চাইলে একটি কার্যকর চুক্তির পথ খুলে দিতে পারত।
প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি অনুযায়ী ৬০ দিন যুদ্ধবিরতি, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং ইসরায়েলের কারাগারে আটক কিছু ফিলিস্তিনি বিনিময়ে হামাসের হাতে থাকা প্রায় ৫০ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। তবে মূল বিরোধ দেখা দেয় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও ৬০ দিনের পরবর্তী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অপমানজনক আলোচনা’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এবার বিজয়ের সময়।
গাজার ২২ লাখ মানুষের জন্য এখন দুর্ভিক্ষ বাস্তবতা হয়ে উঠছে। মার্চে ইসরায়েল গাজার সব রসদ বন্ধ করে দিলে খাদ্য মজুদ শেষ হয়ে যায়। মে মাসে সীমিত সহায়তা প্রবেশের অনুমতি মিললেও তাতে সংকট কাটেনি।
ইসরায়েল শুক্রবার জানায়, তারা বিমানপথে সহায়তা পাঠাতে কিছু দেশের অনুরোধে সম্মতি দিয়েছে। তবে হামাস একে ‘প্রহসন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। হামাস-শাসিত গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের প্রধান ইসমাইল আল-থাওবাতা বলেছেন, গাজা আকাশে কসরত নয়, স্থলপথে স্থায়ী সহায়তা চায়।
গাজায় গত ২৪ ঘণ্টায় অপুষ্টি ও অনাহারে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গত কয়েক সপ্তাহে এরকম মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে।
ইসরায়েল বলছে, তারা যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য প্রবেশ করতে দিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘ তা যথাযথভাবে বিতরণে ব্যর্থ। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘ইচ্ছাকৃত অপপ্রচার’ বলেছে। জাতিসংঘ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, ইসরায়েলি বিধিনিষেধের মধ্যে যতটা সম্ভব কার্যকরভাবে কাজ করা হচ্ছে।
শুক্রবার জাতিসংঘ জানায়, গাজায় মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-খাদ্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও ইসরায়েলি সেনারা স্থল অভিযানে ব্যস্ত। গাজার বিভিন্ন স্থানে হামলায় শুক্রবার কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজা সিটির একটি স্কুলে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো ওপর হামলায় ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এক হামলায় নিহত হন সাংবাদিক আদম আবু হারবীদ। তার দাফনে অংশ নিয়ে সহকর্মী মাহমুদ আওয়াদিয়া বলেন, ইসরায়েল সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা থামব না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ইসরায়েল সীমান্ত পেরিয়ে ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে ও ২৫১ জনকে জিম্মি করে। এর পর থেকেই গাজায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। পুরো উপত্যকা এখন ধ্বংসস্তূপ।
ফ্রান্স স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কড়া সমালোচনা করেছে। নেতানিয়াহু একে ‘সন্ত্রাসের পুরস্কার’ বলেছেন।
যদিও পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে থাকলেও তারা মনে করে, তা আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। জার্মানি বলেছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা জার্মান সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বল্পমেয়াদে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।
ব্রিটিশ রাজনীতিক পিটার কাইল বলেছেন, আমরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চাই। তবে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো গাজার অমানবিক কষ্ট লাঘব করা।







