২৩ বছর কারাগারে থেকেও রাজনীতিতে প্রভাবশালী

‘ফিলিস্তিনি ম্যান্ডেলা’ মারওয়ান বারঘুতিকে ইসরায়েল কেন ভয় পায়?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ অক্টোবর ২০২৫, ২১:০৫আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৫, ২২:২১

ইসরায়েলের কুখ্যাত গানোত কারাগারে মাঝবয়সী এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে হুমকি দিচ্ছেন কট্টরপন্থি ইসরায়েলি মন্ত্রী ইতামার বেন গেভির। আগস্টের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়, আবার আলোচনায় উঠে আসেন ২৩ বছর ধরে বন্দি ফাতাহ দলের জনপ্রিয় সাবেক নেতা মারওয়ান বারঘুতি।

৬৬ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ২০০২ সালে ইসরায়েলে এক বিতর্কিত বিচারের পর থেকে বন্দি আছেন। এর মধ্যে বহু সময় তিনি একাকী সেলে কাটিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দির মধ্যে বারঘুতি সবচেয়ে পরিচিত মুখ। কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত দুই হাজার বন্দির মুক্তির তালিকায় তার নাম নেই।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যান স্টেইনবক বলছেন, বারঘুতি এখনও ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা তাকে মুক্তি দিতে ভয় পায়। কারণ তিনি এমন এক ঐক্যবদ্ধ শক্তি হয়ে উঠতে পারেন যা নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।

সম্প্রতি করা বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, পশ্চিম তীর ও গাজায় বারঘুতি ৫০ শতাংশের বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। হামাস বা মাহমুদ আব্বাস কারো সমর্থন এত বেশি নয়।

‘ফিলিস্তিনি ম্যান্ডেলা’ মারওয়ান বারঘুতিকে ইসরায়েল কেন ভয় পায়?

সাবেক ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আলন লিয়েলও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল ভয় পায় বারঘুতির সেই ক্ষমতাকে, যা ফিলিস্তিনিদের এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া মারওয়ান বারঘুতি ১৫ বছর বয়সে যোগ দেন ফাতাহ আন্দোলনে। এরপর বহুবার কারাভোগ করেন। ২০০২ সালে ইসরায়েল তাকে পাঁচটি হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করে। তবে বারঘুতি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং আদালতের বৈধতাই মানেননি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, তার বিচার ছিল আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তার তুলনা টানেন অনেকেই। ম্যান্ডেলার মতো বারঘুতিও দীর্ঘ কারাবাসের মধ্যেই ফিলিস্তিনের জন্য ঐক্যের বার্তা ছড়িয়েছেন। ২০০৬ সালে বন্দিদশায় তিনি সহবন্দিদের সঙ্গে ‘প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ডকুমেন্ট’ প্রকাশ করেন, যেখানে পূর্ব জেরুজালেম রাজধানী করে ১৯৬৭ সালে দখলকৃত সব ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।

হামাস, ফাতাহ ও অন্যান্য গোষ্ঠীর নেতারা এতে স্বাক্ষর করে। যা তার জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করে। বিশ্লেষক রামজি বারৌদ বলছেন, বারঘুতি ফিলিস্তিনি রাজনীতির এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা দলীয় বিভাজন পেরিয়ে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি চায়।

২০১৭ সালে বারঘুতির নেতৃত্বে কারাগারে এক দীর্ঘ অনশন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষাৎ ও চিকিৎসা অধিকার কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামাস হামলার পর থেকে তিনি আবার একাকী সেলে রয়েছেন, পরিবারের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।

‘ফিলিস্তিনি ম্যান্ডেলা’ মারওয়ান বারঘুতিকে ইসরায়েল কেন ভয় পায়?

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো ও মানবাধিকার আইনজীবী জাহা হাসান বলেন, বারঘুতি এমন এক সেতুবন্ধন, যিনি গণহত্যার পরিস্থিতি থেকে শান্তির রাজনীতিতে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যেতে পারেন।

তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত বর্তমান পরিকল্পনায় গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি নিরপেক্ষ ‘টেকনোক্র্যাটিক’ সরকার পাবে। এই অবস্থায় বারঘুতি এমন এক নেতা, যিনি হামাস ও ফাতাহ উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। তবে ইসরায়েলি সরকার, বিশেষত নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন উগ্র জোট এমন কোনও সমাধান চায় না, যা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা জাগায়।

বন্দিজীবনে বিভিন্ন নির্যাতন সহ্য করেও বারঘুতি এখনও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের অন্যতম প্রতীক। অধ্যাপক সামি আল আরিয়ান বলেন, তিনি এমন এক দেশপ্রেমিক, যিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য ব্যক্তিগত জীবনের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন।

দীর্ঘ বন্দিদশায় থেকেও তিনি ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ‘একীভূত কণ্ঠস্বর’। তার মুক্তি না হলেও, তার নাম আজও পশ্চিম তীর ও গাজার তরুণদের কাছে স্বাধীনতার আশার প্রতীক। ইসরায়েল তাকে যতই কারাগারে আটকে রাখুক না কেন, মারওয়ান বারঘুতি এখনও সেই মানুষ, যিনি ফিলিস্তিনকে এক সেতুবন্ধনের পথে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। তিনিই ‘ফিলিস্তিনি ম্যান্ডেলা’।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কি এখন দুই পথের পথিক?
নিউ জিল্যান্ডের চার এমপির ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা
মদ্যপ স্বামীকে পিটিয়ে হত্যার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর আত্মসমর্পণ
সর্বশেষ খবর
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
পদত্যাগ করেছেন শন টেইট
আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: যা আছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে
আদ-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু: যা আছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে
চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি
চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবিতে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কি এখন দুই পথের পথিক?
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কি এখন দুই পথের পথিক?
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের