গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনি হত্যা নিয়ে মুখ খুললেন ইসরায়েলি সেনারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ নভেম্বর ২০২৫, ২২:২৩আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ২২:২৩

গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও আইনি সীমারেখার ভাঙন নিয়ে মুখ খুলেছেন কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা। সোমবার যুক্তরাজ্যের আইটিভিতে প্রচারিতব্য তথ্যচিত্র ‘ব্রেকিং র‌্যাঙ্কস: ইনসাইড ইসরায়েল’স ওয়ার’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ট্যাংক ইউনিটের কমান্ডার ড্যানিয়েল বলেন, যদি আপনি লাগামছাড়া গুলি চালাতে চান, পারবেন। কেউ আটকাবে না। গাজায় এখন কোনও নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে।

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কিছু সেনা নাম প্রকাশ না করে সাক্ষাৎ দেন, আবার কেউ খোলাখুলি কথা বলেন। তারা সবাই বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের নিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আচরণবিধি কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে।

তথ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারী সেনারা ফিলিস্তিনিদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অথচ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সবসময় এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা আরও জানান, মার্কিন-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে ত্রাণ নিতে যাওয়া সাধারণ মানুষদের ওপরও বিনা উসকানিতে গুলি চালানো হয়েছে।

এলি নামে পরিচয় দেওয়া এক সেনা বলেন, জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করে কমান্ডারের বিবেক। কোনও নিয়ম বা প্রক্রিয়ার গুরুত্ব নেই। তার মতে, কারও হাঁটার গতি, অঙ্গভঙ্গি বা অবস্থানই এখন ‘সন্দেহের কারণ’।

আর্মার্ড কর্পস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইয়োটাম ভিল্ক বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণে শেখানো হতো যে, ‘মিনস, ইনটেন্ট অ্যান্ড অ্যাবিলিটি’। অর্থাৎ টার্গেটের হাতে অস্ত্র, উদ্দেশ্য ও সামর্থ্য থাকতে হবে। গাজায় এখন এর কিছুই নেই। শুধু সন্দেহই যথেষ্ট। ২০ থেকে ৪০ বছরের কোনও পুরুষ হলে গুলি করা হয়।

এলি জানান, এক সিনিয়র কর্মকর্তা একবার ‘নিরাপদ এলাকা’র একটি ভবন ধ্বংসের নির্দেশ দেন। সেখানে ছাদের ওপর একজন মানুষ কাপড় শুকাচ্ছিলেন। তার হাতে দূরবীন বা অস্ত্র ছিল না, সামরিক বাহিনী ছিল ৬০০-৭০০ মিটার দূরে। তবু ট্যাংক থেকে গোলা ছোড়া হয়, ভবন ধসে পড়ে, অনেক মানুষ মারা যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের আগস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক তথ্য অনুসারে গাজায় নিহতদের ৮৩ শতাংশই বেসামরিক, যা আধুনিক যুদ্ধে নজিরবিহীন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৬৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যদিও এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।

লিখিত বিবৃতিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আইডিএফ আইন ও নৈতিকতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হামাসের বেসামরিক স্থাপনা ব্যবহারের জটিলতার মধ্যেও আমরা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কিছু সেনা জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যে তারা প্রভাবিত হন। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ তখন বলেছিলেন, এটা পুরো জাতির দায়িত্ব, বেসামরিক কেউ ‘জড়িত নয়’ এই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

ট্যাংক কমান্ডার ড্যানিয়েল বলেন, যখন বারবার শুনতে হয় যে গাজায় কোনও নিরপরাধ নেই, তখন একসময় তা বিশ্বাসে পরিণত হয়।

ব্রিগেডের এক কর্মকর্তা মেজর নেটা ক্যাসপিন বলেন, আমাদের এক রাব্বি আধা ঘণ্টা ধরে বলেছিলেন যে, ৭ অক্টোবরের মতো প্রতিশোধ নিতে হবে, বেসামরিকদের বিরুদ্ধেও।

চরমপন্থি ধর্মযাজক রাব্বি আভ্রাহাম জারবিভ তথ্যচিত্রে বলেছেন, গাজার প্রতিটি জায়গাই সন্ত্রাসী অবকাঠামো। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষে বুলডোজার চালিয়ে তিনি নিজেই ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নিয়েছেন।

সেনারা আরও স্বীকার করেন যে, ফিলিস্তিনিদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটিকে তারা ‘মশা প্রোটোকল’ নামে অভিহিত করে। ড্যানিয়েল বলেন, মানবঢালকে টানেলে পাঠানো হয়, তার পোশাকে লাগানো আইফোন দিয়ে জিপিএস তথ্য পাঠানো হয়। এই কৌশল দ্রুত পুরো বাহিনীতে ছড়িয়ে পড়ে।

আইডিএফ বলেছে, মানবঢাল ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেখানে নির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, সেগুলোর তদন্ত চলছে।

তথ্যচিত্রে জিএইচএফের এক ঠিকাদার স্যাম বলেন, তিনি দেখেছেন, সেনারা ত্রাণের জন্য দৌড়ে যাওয়া নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করেছে। এক জায়গায় তিনি দেখেছেন, দুই যুবক দৌড়াচ্ছিল, দুই সৈনিক হাঁটু গেড়ে গুলি ছোড়ে, আর তাদের মাথার খুলি ফেটে যায়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য বিতরণকেন্দ্রের আশপাশে কমপক্ষে ৯৪৪ জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক নিহত হয়েছেন। আইডিএফ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সচেষ্ট।

তথ্যচিত্রে সেনাদের মানসিক চাপও উঠে এসেছে। ড্যানিয়েল বলেন, আমি মনে করি, তারা আমার ইসরায়েলি পরিচয়ের সব গর্ব মুছে দিয়েছে। শুধু লজ্জা রয়ে গেছে।

 

/এএ/
সম্পর্কিত
ইরান ও লেবাননে একসঙ্গেই যুদ্ধ শেষ হতে হবে: আরাঘচি
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
সর্বশেষ খবর
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
পদোন্নতি না পাওয়ায় পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি, কমেছে তাপমাত্রা 
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি