লেবাননের অবরুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের জেরে স্থগিত হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নির্ধারিত শান্তি আলোচনা। শুক্রবার দুই দেশের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই ঘটনা ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন খাড়া করেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনও আলোচনায় অংশ না নেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছে তেহরান। এ কারণে ইরানি কর্মকর্তারা সুইজারল্যান্ডে পূর্বনির্ধারিত সফরে যাননি। একই কারণে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তার সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত করেছেন।
বৃহস্পতিবার রাতভর দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে হিজবুল্লাহর আস্তানা লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলায় তাদের ৪ সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হলো ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার এই সংঘাত। কারণ, ইসরায়েল কিংবা হিজবুল্লাহ কোনও পক্ষই এই সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। অথচ এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল তাদের মধ্যকার লড়াইয়ের অবসান ঘটানো। তবে ইরান ইতোমধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে, লেবাননে তাদের স্বার্থ এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্রের সুরক্ষার জন্য তারা এই অঞ্চলে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত।
অবশ্য এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ফলে ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শত্রুতা আপাতত বন্ধ রয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ইরানি হামলা ও হুমকির কারণে এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি করে। তবে দুই দেশের পরবর্তী আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটানো, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখ্য, এই পারমাণবিক ইস্যুটিকে কেন্দ্র করেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল।
চুক্তি ভেস্তে দিতে পারে লেবাননের লড়াই
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ শহরের কাছের একটি গ্রামে তাদের একটি ট্যাংকে হিজবুল্লাহর হামলায় একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এর বাইরে একটি বিস্ফোরক ড্রোন হামলায় আরও ৫ সেনা আহত হয়েছেন।
এর জবাবে নাবাতিয়াহ ও অন্যান্য এলাকায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এক সামরিক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘নগ্নভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। পরবর্তীতে পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকাতেও হামলা চালানো হয়; লেবাননের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী সেখানকার দোরিস গ্রামেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমাদের সেনা বা আমাদের ভূখণ্ডে কোনও ধরনের হামলা বরদাশত করবে না ইসরায়েল। এই হামলার জন্য হিজবুল্লাহকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি ট্যাংকে হামলার কথা স্বীকার করেছে। তবে তাদের দাবি, এটি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পাল্টা জবাব ছিল। হিজবুল্লাহ জানায়, ইসরায়েলি বাহিনী নাবাতিয়াহ শহরের দিকে নজরদারি রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলী আল-তাহের পাহাড়ের উত্তর চূড়া দখলের চেষ্টা করলে তারা এই প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
লেবাননে ইসরায়েলের এই একতরফা পদক্ষেপের কারণে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহুর ওপর ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন, যিনি নিজ দেশেও তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন।
হোয়াইট হাউস ও ইরানের অবস্থানের বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণেই সুইজারল্যান্ডে জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে অস্বীকৃতি জানান ইরানি কর্মকর্তারা। অবশ্য ইরানের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছিল যে ইসরায়েল এই সংঘাত থেকে সরে আসতে প্রস্তুত, তবে হিজবুল্লাহকে আগে হামলা বন্ধ করতে হবে। এর আগে, হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সফর স্থগিতের পেছনে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সংক্রান্ত সমস্যাকে দায়ী করা হয়েছিল।
এদিকে, রুদ্ধদ্বার এই আলোচনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনার টেবিলে না যাওয়ার বিষয়ে ইরানের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ‘হতভম্ব’ হয়ে পড়েছে।
সুইজারল্যান্ডের এই স্থগিত হওয়া আলোচনায় মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কথা হওয়ার কথা ছিল। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে যে পরিমাণ উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, তা দিয়ে তারা চাইলে একাধিক পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী একটি স্থায়ী পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনে আরও বাড়ানো যেতে পারে। যদি ইরান নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি বিশেষ তহবিলসহ বেশ কিছু লোভনীয় প্রণোদনার কথা উল্লেখ রয়েছে চুক্তিতে।









