নাগরিকের দুয়ারে সুশাসন: আশ্বাস নয়, নিশ্চিত অধিকার 

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
১২ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৪:০০

কাকভোর তখনও কাটেনি। সাতক্ষীরার আশাশুনির উপকূলীয় বাঁধে লোনা জল ভেঙে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে সুফিয়া খাতুন দাঁড়িয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের বারান্দায়। হাতে রোদে পোড়া, জলে ভেজা একটি মলিন কাগজ। না, তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার রদবদল চান না, কোনও উচ্চমার্গীয় রাজনীতিও বোঝেন না। তার চাওয়া কেবল একটি—নলকূপের খাবার পানির একটি নতুন সংযোগের আবেদন মঞ্জুর করা এবং অসুস্থ মেয়ের জন্য স্বাস্থ্যকার্ডটি সময়মতো পাওয়া। বেলা বাড়ে, সূর্যের উত্তাপ বাড়ে, কিন্তু অফিসের বদ্ধ ঘরের দরজা খোলে না। যে কর্মকর্তা ভেতর থেকে মাঝে-মধ্যে উঁকি দেন, তার চোখে সুফিয়া খাতুন এক নিঃস্ব ‘আবেদনকারী’ মাত্র, যার জন্য অপেক্ষা করাই যেন কপালের লিখন।

রাজধানী ঢাকা যখন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার রোডম্যাপ, উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক রূপান্তর কমিশন, আর সংবিধান পুনর্লিখনের তাত্ত্বিক বাহাসে উত্তাল, তখন দেশের হাজারো সুফিয়া খাতুনের জীবনের বাস্তব দৃশ্যপট এটিই। আমাদের রাষ্ট্রভাবনায় যখনই ‘রূপান্তর’ শব্দটি উচ্চারিত হয়, আমরা তখন প্রধানত সচিবালয়, এয়ারকন্ডিশন্ড সেমিনার কক্ষ কিংবা পলিসি ব্রিফের দিকে তাকাই। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রূপান্তর কোনও তাত্ত্বিক দলিল বা গেজেট নয়—রূপান্তর হলো সেই মুহূর্তটি, যখন একজন প্রান্তিক নাগরিক তার মৌলিক অধিকারটুকু পেতে গিয়ে কোনও হয়রানি, উৎকোচ কিংবা প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হন না। রাষ্ট্র সংস্কারের আসল পরীক্ষা রাজপথে নয়, সুপ্রিম কোর্টে নয়, উচ্চপর্যায়ের কমিশন রিপোর্টেও নয়—এর সত্যিকারের অগ্নিপরীক্ষা ঘটে নাগরিকের ঘরের দুয়ারে, যখন সে মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্রের মুখোমুখি হয়।

রূপান্তরের আসল পরীক্ষা যেখানে

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সুশাসন গবেষক প্রফেসর ম্যাট অ্যান্ড্রুজ ও তার সহকর্মীরা উন্নয়নশীল বিশ্বের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পর্যালোচনা করতে গিয়ে একটি ধারালো পরিভাষা ব্যবহার করেছেন—‘আইসোমর্ফিক মিমিক্রি’। এর অর্থ হলো, কোনও রাষ্ট্র বাইরে থেকে আধুনিক, চটকদার ও উন্নত প্রশাসনিক কাঠামো বা কমিশন গড়ে তোলার অনুকরণ করে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে সেবা প্রদানের মূল সক্ষমতা ও মানসিকতায় কোনও পরিবর্তন ঘটে না। কাঠামোর এই ফাঁপা প্রদর্শন দিয়েই আমলাতন্ত্র বছরের পর বছর ধরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।

আজকের বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে, তখন আমাদের নির্মোহভাবে প্রশ্ন তুলতে হবে—আমরা কি কেবল নামকাওয়াস্তে নতুন নতুন আইন, কমিশন বা প্রশাসনিক পরিপত্র জারি করেই দায়িত্ব শেষ করবো, নাকি আমলাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে হাত দেবো? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কেবল আয়ের অভাব নয়—এটি সেবাবঞ্চিত হওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কণ্ঠস্বর না থাকা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে বারবার অপমানিত হওয়ার নাম।

আমাদের তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনও সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার অংশীদার মনে করে না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী অফিস কিংবা পৌরসভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়াসা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সেবা—সবখানেই সাধারণ নাগরিককে সেবা গ্রহীতা নয়, বরং অনুগ্রহপ্রার্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। এই জায়গাটিতে আঘাত করাই হলো আজকের দিনের সবচেয়ে জরুরি রূপান্তর।

আইন, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আয়না

বাংলাদেশের সংবিধান কোনও অনুগ্রহের দলিল নয়—এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক পরম মৌলিক চুক্তি। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে খুব স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং মানবসত্তা ও মর্যাদার স্বীকৃতিই হবে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের সংস্থানকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আবার ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বিচারিক ইতিহাসে নতুন ইতিহাস উন্মোচন করে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২-এর অধীনে জীবনের অধিকার ও আইনি সুরক্ষার যে মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার ভেতর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অধিকার যুক্তিযুক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, একজন নাগরিককে বিশুদ্ধ খাবার পানি বা ন্যূনতম স্যানিটেশন সেবা থেকে বঞ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, সরাসরি সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকালেও বাংলাদেশ একাধিক সর্বজনীন চুক্তিতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) ২৫ অনুচ্ছেদ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদের ১১ অনুচ্ছেদে জীবনধারণের পর্যাপ্ত মান ও মৌলিক সেবার অধিকারকে অলঙ্ঘনীয় বলা হয়েছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৬৪/২৯২ নম্বর প্রস্তাবে পরিষ্কার ঘোষণা করা হয় যে নিরাপদ খাবার পানি ও স্যানিটেশন মানুষের অন্যতম প্রধান মানবাধিকার। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি৬) অর্জনের যে জাতীয় অঙ্গীকার, তার কেন্দ্রেও রয়েছে সবার জন্য নিরাপদ ওয়াশ (ডব্লিউএএসএইচ) সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের রাষ্ট্রীয় পলিসি ও জাতীয় নীতিমালায় জনমুখী সেবার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলেও মাঠপর্যায়ের সেবা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতাকে আর খাতা-কলমে আটকে রাখা যাবে না।

শাসক থেকে সেবক: মানসিকতার বৈপ্লবিক রূপান্তর

আমাদের আমলাতন্ত্রের ডিএনএ বা প্রজননকোষ সংগৃহীত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্র থেকে। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন বা ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের যে আত্মা, তা নাগরিককে বিশ্বাস করতে শেখায়নি; শিখিয়েছে নিয়ন্ত্রণ করতে, সন্দেহ করতে ও শাসন করতে। স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আজও যখন একজন সাধারণ মানুষ সরকারি দফতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সেবা পাওয়ার আত্মবিশ্বাস অনুভব করেন না, বরং এক ভয় ও সংকোচে বিহ্বল হন।

যেমনটি এর আগে একাধিকবার জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেছি—প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে কোনও নাগরিকের প্রশ্ন করা মানেই কিন্তু রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। বরং প্রশ্ন করার এই স্বাধীনতাই হলো সুশাসনের প্রথম শর্ত। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তার বিখ্যাত ‘স্টেট বিল্ডিং’ গবেষণায় দেখিয়েছেন—কোনও দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি কেবল কঠোর আইনি প্রয়োগে থাকে না; তা নির্ভর করে নাগরিকের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর কতটা গভীর আস্থানির্ভরতা রয়েছে তার ওপর।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০০৪-এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘মেকিং সার্ভিসেস ওয়ার্ক ফর পুওর পিওপল’। সেখানে দেখানো হয়েছিল, আমলাতন্ত্র যখন সরাসরি সাধারণ নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে না, তখন সেবার মান ভেঙে পড়ে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আমলাতন্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। মাঠপর্যায়ের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা প্রকৌশলীদের বুঝতে হবে—তাদের বেতন-ভাতা ও ক্ষমতা আসে সুফিয়া খাতুনদের ট্যাক্সের টাকায়। তারা শাসক নন, তাঁরা জনগণের সেবায় নিয়োজিত গণসেবক।

প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও নীতিগত বাস্তবতা

সর্বশেষ লোকপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারের রূপকল্পের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও আধুনিকীকরণের নানাবিধ প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। তবে এসব নীতি ও সুপারিশ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। ধরা যাক, উপকূলীয় বা খরাপ্রবণ অঞ্চলের পানির নিরাপত্তার কথা। এখানে একদিকে রয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা), আবার পাশাপাশি রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই দফতরগুলোর মধ্যে যে রশি টানাটানি ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দেখা যায়, তাতে চড়া মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

সরকারি সেবায় নানা ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হয়েছে—জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, প্রযুক্তির এই আড়ালে ডিজিটাল বিভাজন যেন নতুন কোনও দালালি বা হয়রানির জন্ম না দেয়। গ্রামীণ বা নিরক্ষর মানুষ যখন অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে কোনও টেকনিক্যাল জটিলতায় পড়েন, তখন যদি তাদের সহায়তার জন্য কোনও মানবিক প্রশাসনিক হাত বাড়িয়ে দেওয়া না হয়, তবে সেই ডিজিটালাইজেশন নাগরিকের দুয়ারে সেবার দূরত্ব কমায় না, বরং বাড়ায়।

নাগরিকের দুয়ারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন পথরেখা

তাহলে এই জট ছাড়ানোর উপায় কী? কীভাবে আমরা আমলাতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থেই জনমুখী ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারি? নীতিপ্রণেতা ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের কাছে আমাদের স্পষ্ট কিছু কৌশলগত দাবি ও দিকনির্দেশনা পেশ করা প্রয়োজন, যা আইন ও নীতির নিরিখে অবিলম্বে প্রয়োগ করা সম্ভব।

প্রথমত, আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ‘সিটিজেন চার্টার’ বা নাগরিক সনদের আইনি প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সেবা প্রদানের সময়সীমা কেবল দেয়ালে লিখে রাখলে চলবে না। নির্ধারিত সময়ে সেবা না পেলে বা অহেতুক বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের জন্য সরাসরি ক্ষতিপূরণের আইনি প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে কেবল বাজেট খরচ বা ফাইল নিষ্পত্তির সংখ্যা দেখলে চলবে না। সেখানে যুক্ত করতে হবে ‘সিটিজেন স্যাটিসফ্যাকশন ইনডেক্স’ বা নাগরিক সন্তুষ্টির পরিমাপক। যে এলাকার মানুষ নিজের ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল বা উপজেলা প্রশাসনের সেবায় সন্তুষ্ট নয়, সেই এলাকার কর্মকর্তার পদোন্নতি বা সুবিধাজনক পোস্টিং স্থগিত রাখার বিধান থাকা উচিত।

তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ‘জনশুনানি’ আইনত বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের মুক্ত আকাশের নিচে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি বসতে হবে। সেখানে স্থানীয় নাগরিকেরা তাদের পানীয় জলের সমস্যা, স্যানিটেশন সংকট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা ভাতার কার্ড সংক্রান্ত প্রশ্ন সরাসরি তুলবেন এবং কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা) পর্যাপ্ত বাজেট ও নিজস্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। একটি নলকূপ মেরামত বা স্যানিটেশন লাইন সংস্কারের জন্য যদি জেলা শহর বা ঢাকার অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়, তবে তা বিকেন্দ্রীকরণের মূল চেতনার পরিপন্থি।

পঞ্চমত, জলবায়ু দুর্যোগপ্রবণ, উপকূলীয় এবং বস্তি এলাকার নারীদের মৌলিক সেবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষ জেন্ডার-রেসপন্সিভ বাজেট নির্দেশিকা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সুপ্রিয় পানি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনও বিষয় না ভেবে একটি সমন্বিত ‘অধিকার প্যাকেজ' হিসেবে গণ্য করতে হবে।

জনআকাঙ্ক্ষার সার্থক রূপায়ণ

রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট, প্রতিটি সরকারি ভবন এবং প্রতিটি সরকারি পদ গঠিত হয়েছে জনগণের সেবার স্বার্থে। সকল গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী জাতীয় পুনর্গঠনের যে বার্তা, তার মূলে ছিল বৈষম্যহীনতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক বিচার নিশ্চিত করা। সুশাসন কেবল একটি সুন্দর বৈশ্বিক স্লোগান হতে পারে না—এটি হলো সেই স্পর্শযোগ্য অনুভূতি, যা একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি দফতরে গিয়ে খুঁজে পান।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনও জাতি কেবল নতুন সংবিধান বা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে মহান হয় না। একটি রাষ্ট্র তখনই মহান হয়, যখন তার সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অসহায় নাগরিকটি অনুভব করেন যে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, প্রশাসনিক কলকবজা তার শত্রু নয়, বরং তার জীবনকে সহজ করার নির্ভরযোগ্য বন্ধু।

আমরা যদি আমলাতন্ত্রের এই মৌলিক মানসিক পরিবর্তনটি না আনতে পারি, তবে সব রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর অর্থহীন হয়ে পড়বে। আসুন, সংস্কারের সুরকে আমরা ঢাকার কনফারেন্স রুম থেকে বের করে নিয়ে যাই গ্রামের ধূলিমলিন কাঁচা রাস্তায়, সুফিয়া খাতুনের মলিন মুখের সেই হাসিতে। কারণ, যেদিন সাধারণ নাগরিক বিন্দুমাত্র ভয় বা সংকোচ ছাড়া তার ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন—‘এই রাষ্ট্র আমার, এই সেবা আমার অধিকার’, ঠিক সেদিনই সার্থক হবে আমাদের সব ত্যাগের রূপান্তর, সার্থক হবে নতুন বাংলাদেশের পথচলা।

লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা: আপিল বিভাগে চতুর্থ দিনের শুনানি শেষ
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা: আপিল বিভাগে চতুর্থ দিনের শুনানি শেষ
ছবি কেন বাইরে পাঠালা, নেত্রী তো বিরক্ত: ওবায়দুল কাদের-ডিবি হারুনের ফোনালাপ 
ছবি কেন বাইরে পাঠালা, নেত্রী তো বিরক্ত: ওবায়দুল কাদের-ডিবি হারুনের ফোনালাপ 
ভুয়া পরিচয়ে ভাড়া নেওয়া বাসায় ‘বোমা তৈরি’
ভুয়া পরিচয়ে ভাড়া নেওয়া বাসায় ‘বোমা তৈরি’
নেত্রীর মামলায় গ্রেফতার ছাত্রদল নেতার মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
নেত্রীর মামলায় গ্রেফতার ছাত্রদল নেতার মুক্তি দাবিতে বিক্ষোভ
সর্বশেষসর্বাধিক