কী, কেন, কীভাবে

ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা কেন বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৯ জুন ২০২৬, ১৮:৪৫আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১৮:৪৫

তুরস্কের সঙ্গে ক্রমাগত বাড়তে থাকা চরম উত্তেজনার জের ধরে এবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ‘আর্মেনীয় গণহত্যা’কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি কোনও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে নয়, বরং তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের সঙ্গে চলমান বৈরিতায় নতুন চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে এ বিষয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সাআর ঘোষণা করেন, নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে অটোমান সাম্রাজ্যের শেষের দিকে আর্মেনীয় জনগণের ওপর সংঘটিত গণহত্যাকে ইসরায়েল স্বীকৃতি দেবে।

তিনি আরও বলেন, এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার, খাটো করে দেখা কিংবা বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে অবশ্যই নিন্দা জানাতে হবে।

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯১৫-১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ আর্মেনীয় সিরিয়ার মরুভূমিতে মৃত্যুর মিছিলে (ডেথ মার্চ) প্রাণ হারান। আরও অনেককে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। বহু পশ্চিমা সরকার ও গবেষক এই হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আঙ্কারা তা অস্বীকার করে আসছে। তুরস্কের দাবি, পরিকল্পিত কোনও নিধনযজ্ঞ নয়, বরং যুদ্ধ, রোগবালাই ও দুর্ভিক্ষের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছিল।

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে ‘নিন্দনীয় রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে দেখছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ার নাভোট। তিনি বলেন, ইহুদি জনগণের ইতিহাস বিবেচনায় আর্মেনীয় ও রুয়ান্ডা গণহত্যাকে বহু বছর আগেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানের এই স্বীকৃতি স্রেফ একটি অনৈতিক চাল, তুরস্ককে খোঁচা দেওয়া এবং এরদোয়ানের গালে চড় মারার একটি উপায় মাত্র।

স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘদিনের অস্বীকৃতি

ইসরায়েলের আইনসভা নেসেট-এ আর্মেনীয় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলেছে। ২০১৫ সালে গণহত্যার শততম বার্ষিকীতে নেসেটের শিক্ষা কমিটি এটি স্মরণ করে। তৎকালীন স্পিকার ইউলি এডেলস্টেইন সরকারকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতির আহ্বান জানালেও তা উপেক্ষিত হয়। ২০১৮ সালে মেরেৎজ দলের আইনপ্রণেতা তামার জান্ডবার্গ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রস্তাব তুললে লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন জোট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিরোধিতা করে। সে সময় তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছিল, ১৯১৫ সালের ঘটনাকে হলোকাস্টের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা ইসরায়েলের নিজের জন্যই চরম ক্ষতিকর হবে।

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং হলোকাস্টের হিব্রু নাম শোহ-এর সঙ্গে এর সমান্তরাল তুলনা এড়াতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘আর্মেনীয় ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করার প্রস্তাব দেয়। তবে জান্ডবার্গ তা প্রত্যাখ্যান করলে প্রস্তাবটি ভেস্তে যায়।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তুরস্ক যখন গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার মামলায় যোগ দেয়, তখন তৎকালীন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন, যে দেশ আর্মেনীয় গণহত্যা চালিয়েছে তারা আজ আন্তর্জাতিক আদালতে তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার বড়াই করছে। আমরা আর্মেনীয় গণহত্যা ও কুর্দিদের ওপর চালানো নিধনযজ্ঞ ভুলে যাইনি।

এছাড়া গত আগস্টে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন যে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে আর্মেনীয় গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নেসেটে এই সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস হয়েছে। সঞ্চালক যখন প্রশ্ন করেন কেন কোনও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কখনও এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেননি, নেতানিয়াহু জবাবে বলেন, ‘আমি এইমাত্র তা করলাম’।

আর্মেনিয়ার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক

ইসরায়েলে প্রায় ৬ হাজার আর্মেনীয় বসবাস করেন, যাদের বেশিরভাগই প্রাচীন আর্মেনীয় অ্যাপোস্টোলিক চার্চের অনুসারী। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৯২ সালে আর্মেনিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইসরায়েল। ১৯৯৭ সালে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে যৌথ চেম্বার অব কমার্স খোলা হয়।

দুই জাতির ইতিহাসেই নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনও খুব একটা উষ্ণ হয়নি। আর্মেনিয়া ২০২০ সালে তেল আবিবে তাদের দূতাবাস খুললেও ইসরায়েল আজ পর্যন্ত আর্মেনিয়ায় কোনও দূতাবাস স্থাপন করেনি। এর বড় কারণ হলো আজারবাইজানের সঙ্গে ইসরায়েলের শক্তিশালী কূটনৈতিক, কৌশলগত ও জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পর্ক। নাগর্নো-কারাবাখ সংঘাতের (১৯৮৮-২০২৩) সময় আজারবাইজানকে ইসরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিকমেত হাজিয়েভ তথ্য প্রকাশ করার পর আর্মেনিয়া তেল আবিব থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়।

ইসরায়েলি-আর্মেনীয় অ্যাক্টিভিস্ট হাগোপ জেরনাজিয়ান আক্ষেপ করে বলেন, বহু বছর ধরে আমরা ইসরায়েল যাতে এই গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেয় সেজন্য লবিং করেছি, কিন্তু আজ ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এটি নিয়ে কারও আগ্রহ নেই। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি সরকারগুলো উপযুক্ত সময় নয় বলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করেছে।

ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্কের চরম অবনতি

২০১০ সালে গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া তুর্কি জাহাজ মাভি মারমারা-তে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৯ জন তুর্কি নাগরিক নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে ধস নামে। দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০২২ সালের মার্চে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আঙ্কারা সফর করলে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজা যুদ্ধ সেই মেলবন্ধনের ইতি ঘটায়।

গাজা যুদ্ধ ছাড়াও ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে (যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে) ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধেরই তীব্র নিন্দা জানান এরদোয়ান। শুধু ইরান ইস্যুই নয়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তুর্কি-সমর্থিত সাবেক জিহাদি নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা’র উত্থানে চরম উদ্বিগ্ন ইসরায়েল। নতুন দামেস্ক-আঙ্কারা অক্ষের কারণে তুরস্ক এখন সরাসরি ইসরায়েল সীমান্তে অবস্থান করছে। গত ১০ জুন তুর্কি পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে এরদোয়ান স্পষ্ট বলেন, লেবানন ও সিরিয়ায় নেতানিয়াহু ও তার খুনি চক্রের হামলা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা তুরস্কের জন্যও হুমকি।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। গত বুধবার ট্রাম্প বলেন, আমি তাকে (এরদোয়ান) পছন্দ করি, সে আমার বন্ধু এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সে জড়ায়নি। সে ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামার বড় দাবিদার ছিল কারণ সে ইসরায়েলকে পছন্দ করে না। আমি তাকে দূরে থাকতে বলেছিলাম এবং সে তা-ই করেছে।

তাছাড়া গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের কাছে ৭০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের জেট ইঞ্জিন বিক্রির বিষয়টি কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে চলমান বিরোধের একটি মীমাংসা করে তুরস্ককে আবারও মার্কিন এফ-৩৫ ফাইটার জেট প্রোগ্রামে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিতও দিয়েছেন ট্রাম্প, যা থেকে তুরস্ককে আগে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বিশ্লেষক ইয়ার নাভোটের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের কাছ থেকে শীতল আচরণ পাচ্ছে ইসরায়েল। তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে গিয়ে তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থকে উপেক্ষা করেছেন। ট্রাম্পের এরদোয়ান প্রীতি এবং তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির খবর ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

সূত্র: আল মনিটর

/এএ/
সম্পর্কিত
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
হামাসের বিরুদ্ধে নতুন ইসায়েলি অভিযানের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের
নিরাপত্তাশঙ্কায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মন্থর
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
ঢাকার অ্যাপোলো ক্লিনিকে আন্তর্জাতিক সিএমই
ঢাকার অ্যাপোলো ক্লিনিকে আন্তর্জাতিক সিএমই
এবার কোক স্টুডিওর নিরীক্ষার বলি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’, সমালোচনা-নিন্দার ঝড়
এবার কোক স্টুডিওর নিরীক্ষার বলি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’, সমালোচনা-নিন্দার ঝড়
হামাসের বিরুদ্ধে নতুন ইসায়েলি অভিযানের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের
হামাসের বিরুদ্ধে নতুন ইসায়েলি অভিযানের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে অর্থনীতিতে কী ঘটতে পারে?
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে অর্থনীতিতে কী ঘটতে পারে?
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের