ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামাসের সামরিক শাখা আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) সামরিক গোয়েন্দা অধিদফতর এবং সাউদার্ন কমান্ড। গত সপ্তাহে আইডিএফের চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামিরের কাছে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলে ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন নিশ্চিত করেছে।
সূত্রবিহীন ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামাস প্রতি মাসে শত শত বিস্ফোরক ডিভাইস ও অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল তৈরি করছে এবং ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী তরুণদের নিজেদের বাহিনীতে নিয়োগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা সম্প্রতি তাদের বিশেষ ‘নুখবা’ বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণও নতুন করে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে আইডিএফ গাজার যেসব ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ধ্বংস করেছিল, হামাস সেগুলো পুনর্নির্মাণ করছে এবং সিনাই সীমান্ত দিয়ে ড্রোন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম চোরাচালানের চেষ্টা চালাচ্ছে। জামিরের কাছে সতর্কবার্তা দিয়ে সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে হামাস এখনও শক্তিশালী। কেউ তাদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারছে না এবং তারা গাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে একেবারেই নারাজ।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আইডিএফ মনে করছে যে হামাসের বিরুদ্ধে তাদের আবার নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা উচিত। তবে এই অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন গাজা উপত্যকায় বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ট্রাম্পের এই শান্তি পরিকল্পনার ফলেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ শেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল।
তবে এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ, যার মধ্যে রয়েছে গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন; তা এখনও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। হামাসের দাবি, মানবিক সহায়তা, সেনা প্রত্যাহার এবং হামলা বন্ধের মতো প্রথম ধাপের সব শর্ত ইসরায়েল পুরোপুরি পূরণ না করা পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। অন্যদিকে, বোর্ড অব পিসের গাজা বিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ যুক্তি দেখিয়েছেন, হামাস যদি দ্বিতীয় ধাপের নিরস্ত্রীকরণের শর্তে রাজি হয়, তবেই কেবল ইসরায়েল প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে চলবে।
শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে না চলায় যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আইডিএফের দাবি, তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব দিচ্ছে এবং সেনাদের ওপর হামলার ছক নস্যাৎ করছে। সোমবার আইডিএফ জানায়, রবিবার উত্তর গাজায় এক হামলায় ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের সদস্য জহের আবু সালেম নিহত হয়েছেন, যিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে বেসামরিক নাগরিকদের অপহরণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আইডিএফ আরও জানায়, আবু সালেম সম্প্রতি আইডিএফ সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এবং তিনি এক হুমকি ছিলেন।
এদিকে, গাজায় হামাস-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সোমবার সকালে মধ্য গাজার ডেইর আল-বালাহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় মালেক আবু শাওইশ নামের এক ৮ বছরের শিশুসহ ৩ জন নিহত হয়েছে। তবে এই হামলার বিষয়ে আইডিএফ তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, মন্ত্রণালয় যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকদের আলাদা করে দেখায়নি। এই একই সময়ে ৫ জন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
হামলার পাশাপাশি আইডিএফ ধীরে ধীরে গাজার ভেতরে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানাও বাড়িয়ে চলেছে। যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে তারা গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, যা এখন বাড়িয়ে অন্তত ৬০ শতাংশ করার দাবি করেছে সামরিক বাহিনী। গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, তিনি গাজা উপত্যকার অন্তত ৭০ শতাংশ এলাকা পুনর্দখল করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণহীন এলাকাগুলোতে হামাসই কার্যত সরকার হিসেবে বহাল রয়েছে। হামাস অস্ত্র ছাড়তে রাজি হলেই কেবল সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও হামাস তাদের শাসনের জন্য হুমকি মনে হওয়া ব্যক্তি ও রাজনৈতিক বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে গাজা উপত্যকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা কেন বাড়ছে
নিরাপত্তাশঙ্কায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মন্থর
কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলার পাচ্ছে ইরান, দাবি পেজেশকিয়ানের
আপাতত হামলা বন্ধে রাজি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, চলবে আলোচনা







