পরবর্তী ‘ইরান’ হওয়ার শঙ্কায় তুরস্ক, তৈরি করছে ৬০ হাজার টনের বিমানবাহী রণতরি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৫৫আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৪

বিশ্বের নজর যখন হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধের দিকে, তখন তুরস্কের শিপইয়ার্ডগুলোতে নিঃশব্দে চলছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশটির প্রথম নিজস্ব বিমানবাহী রণতরি মুগেম-এর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে আঙ্কারা। গত সপ্তাহে তুর্কি নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এরকুমেন্ট তাতলিওলু জানিয়েছেন, আগামী বছরের শেষ নাগাদ এই রণতরিটির নির্মাণকাজ শেষ হবে।

ঘোষিত সময়সূচির প্রায় এক বছর আগেই রণতরিটির মূল কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হতে যাচ্ছে। এটি তুরস্কের ইতিহাসে নির্মিত সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ।

নির্মাণাধীন এই রণতরিটির ওজন হবে ৬০ হাজার টন এবং দৈর্ঘ্য ২৮৫ মিটার। এটি ফরাসি রণতরি শার্ল দ্য গল-কেও ছাড়িয়ে যাবে, যা বর্তমানে ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপ হিসেবে পরিচিত। মুগেম-এ অন্তত ৬০টি বিমান ও ড্রোন মোতায়েন করা সম্ভব হবে এবং এতে থাকবে দ্রুত টেক-অফ ব্যবস্থা।

২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের উপস্থিতিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। আঙ্কারার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তুরস্ক নিজের সামরিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, যা যেকোনও রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

তুরস্কের এই সামরিক তৎপরতার পেছনে ইসরায়েলের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলি সরকারি ও বিরোধীদলীয় নেতারা তুরস্ককে ‘পরবর্তী ইরান’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ইসরায়েলের জনপ্রিয় বিরোধী নেতা ও পরবর্তী সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে এক সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তুরস্ক হলো ‘পরবর্তী ইরান’।

ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের ক্রমবর্ধমান ত্রিপক্ষীয় জোট তুরস্ককে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একঘরে করে ফেলছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তুর্কি নৌশক্তি বিশেষজ্ঞ মেসুন ইয়াসার বলেন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা তুরস্কের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ অবস্থায় রণতরি নির্মাণ আঙ্কারার জন্য শুধু সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা।

তুরস্কের বিমানবাহী রণতরি তৈরির চিন্তা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে হলেও ২০১৭ সালে এটি বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। শুরুতে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও ২০১৯ সালে তুরস্ককে এই কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় ওয়াশিংটন। ফলে নিজস্ব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকেছে আঙ্কারা।

মুগেম-এ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের ‘কান’ ফাইটার জেটের নৌ-সংস্করণ, ‘কিজিলএলমা’ ড্রোন এবং ‘হুরজেট’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি টিসিজি আনাদোলু-তে সফলভাবে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বায়রাক্তার টিবি-৩ ড্রোনও থাকবে এতে।

সাবেক তুর্কি রাষ্ট্রদূত আলপার কোসগুন মনে করেন, এই রণতরি ন্যাটোতে তুরস্কের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। তবে এর কিছু ঝুঁকিও দেখছেন তিনি। কোসগুন বলেন, এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে নতুন ধরনের ‘হুমকি’ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সাবেক অ্যাডমিরাল এবং বর্তমানে তুরস্কের বিরোধী দল সিএইচপির উপ-চেয়ারম্যান ইয়ানকি বাসিওলু মনে করেন, আর্থিক সংকটের এই সময়ে রণতরি নির্মাণের চেয়ে নিজস্ব ‘কান’ ফাইটার জেট এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, উত্তর সাইপ্রাসে তুরস্কের যে বিমানঘাঁটি আছে, সেটি ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে একটি ‘অডুবন্ত রণতরি’ হিসেবে কাজ করছে।

তুরস্ক বর্তমানে উত্তর আফ্রিকা (লিবিয়া) এবং হর্ন অব আফ্রিকায় (সুদান ও সোমালিয়া) নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে। সোমালিয়ার উপকূলে জ্বালানি অনুসন্ধান এবং মহাকাশ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে আঙ্কারার। এসব স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী রণতরি তুরস্কের জন্য বড় ঢাল হতে পারে।

শিপইয়ার্ড কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রিসেপ এরদিনচ ইয়েতিন জানিয়েছেন, কাজ যে গতিতে এগোচ্ছে তাতে এ বছরই রণতরির ফ্লাইট র‍্যাম্প পরীক্ষা করা হবে। একাধিক শিপইয়ার্ডে মেগা-ব্লক তৈরির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে জাহাজটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ মেসুন ইয়াসারের মতে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও আঙ্কারা ধীরে ধীরে এই সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে এই রণতরি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুরস্কের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

 

/এএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
হামাসের বিরুদ্ধে নতুন ইসায়েলি অভিযানের বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের
কী, কেন, কীভাবেইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা কেন বাড়ছে
সর্বশেষ খবর
পুঁজিবাজারে ফিরছে আস্থা, কর ছাড়ের বড় প্যাকেজ আনলেন অর্থমন্ত্রী 
পুঁজিবাজারে ফিরছে আস্থা, কর ছাড়ের বড় প্যাকেজ আনলেন অর্থমন্ত্রী 
ব্যাংক খাতে এস আলমের ফেরার পথ বন্ধ হলো?
ব্যাংক খাতে এস আলমের ফেরার পথ বন্ধ হলো?
বাতিল হচ্ছে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ‘বিতর্কিত’ ধারা 
বাতিল হচ্ছে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ‘বিতর্কিত’ ধারা 
পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রসঙ্গে যা বললেন অর্থমন্ত্রী 
পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রসঙ্গে যা বললেন অর্থমন্ত্রী 
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
‘পুলিশের সিনেমা শেষ, সবাই চল, ভাই বের হয়ে গেছে’
ভারতীয় ভিসা আবেদন জমার শুরুর দিনে দীর্ঘ লাইন
ভারতীয় ভিসা আবেদন জমার শুরুর দিনে দীর্ঘ লাইন