যুদ্ধের মধ্যেও কীভাবে ‘নিরপেক্ষ’ থাকছে এরদোয়ানের তুরস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৫ জুলাই ২০২৬, ২১:৫৯আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১:৫৯

আঙ্কারায় পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর ৩৬তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির স্পটলাইট এখন তুরস্কের ওপর। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও বৈশ্বিক উথাল-পাথালের এই চরম অস্থিতিশীল সময়েও নিজেকে শান্ত ও স্থিতিশীলতার এক অনন্য দ্বীপ হিসেবে ধরে রাখার দাবি করে আসছে দেশটি। আগামী ৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠেয় এই শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপের ৩০টি এবং উত্তর আমেরিকার দুটি দেশের নেতাদের স্বাগত জানাবেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। ২০০৪ সালের পর এই প্রথম উচ্চপর্যায়ের এই হাই-প্রোফাইল ইভেন্টটি একক স্বাগতিক দেশ হিসেবে আয়োজন করছে তুরস্ক।

১৯৪৯ সালে ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জোটের দুর্বল দেশগুলোকে শত্রুপক্ষের আগ্রাসন থেকে সফলভাবে রক্ষা করে আসছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোতে সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে তাদেরই। শুধু তা-ই নয়, ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং বৃহত্তম সাবমেরিন বহরও তুরস্কের দখলে।

এমন এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের প্রভাবে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণই নেই, যা পুরো অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। ঠিক এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই অন্তর্মুখী হয়ে উঠছে; ওয়াশিংটন সংকটের সময়ে ন্যাটোর জন্য বরাদ্দ করা সামরিক সম্পদের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে এবং ন্যাটোভুক্ত অন্য অংশীদারদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চারপাশের এই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উত্তাপের মাঝেও তুরস্ক নিজেকে একজন নিরাপত্তা প্রদানকারী, কূটনৈতিক সেতু এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষাবলয় বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আলাদা করে চেনাতে পেরেছে। তারা বলছেন, তুরস্কের ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল, দূরদর্শিতা ও কার্যকর সম্পৃক্ততার নীতিই দেশটিকে অসংখ্য সংকটের আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর দক্ষিণ সীমান্তে (ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বেষ্টিত ভৌগোলিক অঞ্চল) নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের হায়দার আলিয়েভ সেন্টার ফর ইউরেশিয়ান স্টাডিজ-এর পরিচালক ইয়াসার সারি বলেন, আঙ্কারার জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরীক্ষাটি ছিল ইরান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার তুর্কি আকাশসীমায় প্রবেশ করা বা ধেয়ে আসা ইরানি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রুখে দিতে ন্যাটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ব্যবহার করেছে তুরস্ক।

তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনাগুলো একদিকে যেমন ঝুঁকি মোকাবিলায় তুরস্কের কার্যকারিতা তুলে ধরে, অন্যদিকে ন্যাটোর জন্য একটি কৌশলগত দ্বিধাও তৈরি করে, তা হলো ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ সক্রিয় করার মতো পরিস্থিতি না হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বৃহত্তর সংঘাত এড়ানো যায়। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কোনও সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা বলে গণ্য করা হয় এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ইয়াসার সারির মতে, তুরস্কের এই সতর্ক অবস্থান মূলত সংঘাতের গভীরে না জড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করার এক ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়াস।

আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মেসুত হাক্কি কাসিন বলেন, কৃষ্ণসাগরে ১৯৩৬ সালের মন্ট্রেক্স কনভেনশন কঠোরভাবে মেনে চলেছে তুরস্ক। তারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলোর যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে মাইন অপসারণ অভিযান চালিয়ে দীর্ঘতম কৃষ্ণসাগর উপকূলভাগ এবং তুর্কিশ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে আঙ্কারা। এছাড়া ন্যাটোর পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা রোমানিয়া ও ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ এবং টিবি২ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

তিনি আরও জানান, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে (দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার মধ্যবর্তী জলভাগ) সাইপ্রাস, এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, নিজস্ব জলসীমা, একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সম্পদের ওপর নিজেদের সীমারেখা স্পষ্ট করতে ১৫-টি জাহাজ ও ২০ হাজার সেনার অংশগ্রহণে বিশাল নৌমহড়া চালিয়েছে তুরস্ক। বর্তমানে দেশটি ৫০টি জাহাজ দিয়ে ন্যাটোকে সমর্থন দিচ্ছে এবং অন্য সদস্য দেশগুলোর কাছে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি করছে।

হাসান কালিয়নচু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ কেসার বলেন, সিরিয়া ও লিবিয়াতেও তুরস্ক তার সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখিয়েছে। সেখানে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তুরস্ক নতুন কোনও বড় বৈশ্বিক সংকট ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সাহায্য করেছে।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, তুরস্ক কখনোই কোনও নির্দিষ্ট ব্লকের সঙ্গে নিজেকে একচেটিয়াভাবে যুক্ত করেনি, যা সব আঞ্চলিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার ব্যাপারে তাদের দৃঢ় সংকল্পকে প্রমাণ করে। আহমেদ কেসার জানান, তুরস্ক আইনি বৈধতার ওপর ভিত্তি করে একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি’ অনুসরণ করে সব পক্ষের সঙ্গে দাফতরিক ও ব্যক্তিগত উভয় স্তরেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সংঘাতের বিস্তার রোধে দেশটি মধ্যস্থতাও করছে।

ইয়াসার সারি বলেন, ইসরায়েল ছাড়া বাকি সব যুদ্ধরত পক্ষের সঙ্গে তুরস্কের উন্মুক্ত যোগাযোগ রয়েছে, যা দেশটিকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং কূটনীতির একটি নির্ভরযোগ্য ঘাঁটি হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের আঞ্চলিক সফর এবং তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের চতুর্মুখী জোটের অংশ হিসেবে সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তুর্কি, মিসরীয় ও পাকিস্তানি বাহিনীর যৌথ সামরিক মহড়াকে এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন মেসুত হাক্কি কাসিন।

ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমোজ প্রণালি কয়েক মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকার কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই তেল ও গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথেই সরবরাহ হতো। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়, তখন তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপগুলো দারুণভাবে কাজে দেয়।

ইয়াসার সারির মতে, উৎসের বৈচিত্র্যকরণ, বিকল্প পরিবহন চালু এবং পরিস্থিতির ওপর সক্রিয় নজরদারির কারণেই তুরস্ক এই সংকটে সফল হয়েছে। আহমেদ কেসার এই সফলতার ভিত্তি হিসেবে বাকু-তিবিলিসি-জেহান পাইপলাইন ও ইউরোপে রুশ গ্যাস সরবরাহের করিডোর ‘তুর্কস্ট্রিম’-এর মতো বহু বছরের পুরোনো মেগা প্রকল্পগুলোকে চিহ্নিত করেছেন, যা তুরস্ককে উত্তর, পূর্বের ককেশাস ও দক্ষিণের ইরাকের জ্বালানি সম্পদের একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে’ পরিণত করেছে। তিনি বলেন, তুরস্ক কেবল নিজের জন্যই নয়, বরং আমদানির ওপর নির্ভরশীল বহু পশ্চিমা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জামিনদার হয়ে উঠেছে।

ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার এই অনন্য সংমিশ্রণ তুরস্ককে আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে আসা পুঁজির জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। ইয়াসার সারি জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও শক্তিশালী সরবরাহ চেইনের কারণে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও তুরস্ক একটি নিরাপদ বিনিয়োগের দেশ। ২০২৫ সালে দেশটির জিডিপি ৩.৬ শতাংশ বেড়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মাথাপিছু আয় ১৮,০৪০ ডলারে ঠেকেছে, যা তুরস্ককে উচ্চ আয়ের দেশের তালিকায় নিয়ে গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব এশিয়ার বহু কোম্পানি এখন তাদের কার্যক্রম ও পুঁজি তুরস্কে স্থানান্তর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আহমেদ কেসারের মতে, আঙ্কারার এই স্থিতিশীলতার নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের সুনামকে স্বাভাবিকভাবেই অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তুরস্ক এখন আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও আইনি বৈধতার প্রশ্নে একটি ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতার দ্বীপ’, একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স পয়েন্ট বা নিরপেক্ষ সালিসকারী হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

/এএ/
সম্পর্কিত
১২ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
আমেরিকাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়েছে ইরান, ভারতীয় পন্ডিতের বক্তব্য ভাইরাল
সর্বশেষ খবর
একসঙ্গে তিন বন্ধুর মৃত্যু
একসঙ্গে তিন বন্ধুর মৃত্যু
১২ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন
১২ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন
মাকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে যুবককে গলা কেটে হত্যা, দুই ভাই আটক
মাকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে যুবককে গলা কেটে হত্যা, দুই ভাই আটক
আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান: সংস্কৃতি মন্ত্রী
আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান: সংস্কৃতি মন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
প্রিপেইড মিটারের ভাড়া বহাল, ‘প্রত্যাহার’ ছিল গুজব
প্রিপেইড মিটারের ভাড়া বহাল, ‘প্রত্যাহার’ ছিল গুজব
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’  
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’