যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরব থেকে আসা তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে লোহিত সাগরে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধে দুটি সৌদি ট্যাঙ্কারে তারা হামলাও চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ফলে খুব শিগগিরই হুথিদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে এমন পদক্ষেপ ইরানের প্রক্সিভিত্তিক আঞ্চলিক কৌশলের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ
হুথিরা ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষের অন্যতম মিত্র। এক দশকের বেশি সময় ধরে তারা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে চলাচলকারী জাহাজে হামলা ও নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোরও তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের দূরত্ব প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়।
হুথিদের এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়, যখন তেহরান তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত লোহিত সাগরের পথ বন্ধ করে দিতে।
অবরোধের প্রভাব কী হবে
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র করতে পারে। কারণ, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।
বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ ও লোহিত সাগর একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ায় হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান-সমর্থিত হুথিরা যদি সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়, তাহলে তিনি ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ইয়েমেন বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের পরবর্তী প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের (ওরসাম) উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকা স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক কান দেভেজিওগলু মনে করেন, হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বেড়েছে। তবে ওয়াশিংটন বড় আকারের স্থল অভিযান এড়িয়ে চলবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন অবকাঠামো, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সরবরাহ নেটওয়ার্কে নির্ভুল বিমান হামলার কৌশলই অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি সামুদ্রিক বাণিজ্য সুরক্ষায় নৌবাহিনীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
দেভেজিওগলুর মতে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও লজিস্টিক সহায়তাও বাড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
তার মতে, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইয়েমেন যুদ্ধ নতুন করে শুরু করা নয়; বরং হুথিদের এমন সক্ষমতা দুর্বল করা, যাতে তারা আঞ্চলিক নৌ চলাচল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে এবং একই সঙ্গে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কম থাকে।
ইয়েমেনে মার্কিন হামলার ঝুঁকি কতটা
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট মিডল ইস্ট সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের সহযোগী পরিচালক জোজে পেলায়োও মনে করেন, ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বেশি এবং ক্রমবর্ধমান।
তার মতে, হুথিরা যদি সৌদি আরবের তেল রফতানিতে আঘাত হানতে বাণিজ্যিক জাহাজে অবরোধ কার্যকর করে, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিতে পারে।
পেলায়ো বলেন, সম্ভাব্য অভিযানে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিমান ও নৌ হামলা চালানো হতে পারে। একই সঙ্গে হামলার পাশাপাশি সমন্বিত নৌ এসকর্ট ব্যবস্থাও দেখা যেতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অগ্রগতি যাচাই করতে আপাতত এমন হামলা কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। কারণ, এই মুহূর্তে নতুন হামলা ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধফ্রন্ট খোলার মতো হিসেবে দেখা হতে পারে, যা বিবদমান পক্ষগুলোর বিবেচনায় থাকা ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে দুর্বল করে দিতে পারে।
একসঙ্গে দুই অভিযান কি চালাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সমান্তরাল অভিযান পরিচালনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন।
দেভেজিওগলু বলেন, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান শক্তি দুই অঞ্চলেই একযোগে অভিযান পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সেই অভিযান টিকিয়ে রাখা।
তার মতে, দুটি সক্রিয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা অঞ্চলে একসঙ্গে অভিযান চালাতে গেলে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, নৌসম্পদ ছড়িয়ে পড়বে এবং ভুল হিসাব থেকে সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি বলেন, লোহিত সাগর ও হরমুজকে আলাদা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভূমধ্যসাগর, বাব আল-মান্দেব, এডেন উপসাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চল সব মিলিয়ে এগুলো একটি আন্তঃসংযুক্ত সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব পুরো আঞ্চলিক বাণিজ্যব্যবস্থা, জাহাজ চলাচল, বিমা ব্যয় ও সামরিক মোতায়েনের ওপর পড়ে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর আরও বেশি দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
ইরানের জন্য কতটা উদ্বেগের
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সরাসরি হস্তক্ষেপ ইরানের বৃহত্তর প্রক্সি কৌশলেও বড় প্রভাব ফেলবে।
দেভেজিওগলু বলেন, তেহরানের ‘ফরওয়ার্ড ডিটারেন্স’ কৌশলের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের বদলে অরাষ্ট্রীয় মিত্রদের ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংঘাত এড়িয়ে চলা। হুথিরা তুলনামূলক কম খরচে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হুমকির মুখে ফেলতে পারায় তারা ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত অংশীদারদের একটি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘ সময় ধরে হুথিদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেয়, তাহলে ইরান ইরাক, সিরিয়া বা অন্য অঞ্চলের প্রক্সি নেটওয়ার্কে আরও বেশি সমর্থন দিয়ে চাপ বিভিন্ন ফ্রন্টে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তেহরান এমন কোনও পদক্ষেপ এড়িয়ে চলবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। বরং সীমিত মাত্রার উত্তেজনা, অসম যুদ্ধ এবং অস্বীকারযোগ্য প্রক্সি অভিযানকেই তারা অগ্রাধিকার দিতে পারে।
পেলায়োও মনে করেন, যুদ্ধের পরও হুথিরাই ইরানের সবচেয়ে কার্যকর প্রক্সি শক্তি হিসেবে রয়েছে। তারা এখনও লোহিত সাগরের নৌ চলাচল, নৌপথের স্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তার মতে, ইরান ও হুথিদের ওপর একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা তেহরানকে এই বার্তা দেবে যে, আরেকটি প্রক্সিকে সক্রিয় করলেও যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করা যাবে না।
কোন কৌশলে এগোবে ইরান
হুথিদের ঘোষিত অবরোধ ইরানকে এমন একটি ‘মধ্যবর্তী উত্তেজনা সৃষ্টির কৌশল’ দিয়েছে, যাতে পুরোপুরি যুদ্ধে প্রক্সিকে নামানো ছাড়াই প্রয়োজনমতো চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
পেলায়ো সতর্ক করে বলেন, লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও বাড়লে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে সৌদি আরব। কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটি রফতানির জন্য এখন পুরোপুরি এই করিডরের ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, হুথিদের আরও হামলা সৌদি আরবের বিকল্প রফতানি পরিকল্পনাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। স্বল্পমেয়াদে স্থলপথে তেল পরিবহনের কার্যকর বিকল্পও নেই।
তিনি আরও বলেন, সৌদি অবকাঠামোর ওপর নতুন হামলা হলে রিয়াদের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং দেশটির স্থিতিশীলতার ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
মোদির সোশ্যাল মিডিয়া ‘গেম’ পাল্টে দিচ্ছে জেন-জি
যন্তর মন্তরে সিজেপি’র বিক্ষোভে ৮৪ বছরের বৃদ্ধ
সৌদি-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি কি বদলে দেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য
লোহিত সাগরে সৌদি ট্যাঙ্কারে হুথিদের হামলা
একা পুলিশের গাড়ি আটকে ভাইরাল রিহা
‘মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেবো’, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পুলিশ সদস্যের হুমকি
যন্তর মন্তর যেভাবে হয়ে উঠলো দিল্লির জনপ্রিয় বিক্ষোভস্থল
মিম, রিলস ও পোস্টারে প্রতিবাদ: যন্তর মন্তরে তরুণদের অস্ত্রের নাম হাস্যরস







