রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার কি অন্তর্বর্তী আদেশেই সীমাবদ্ধ?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:২৯, জানুয়ারি ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪১, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলায় মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে মিয়ানমারকে ওই জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্লেষকরা এই আদেশকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন। একে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত নিপীড়ন-নির্যাতনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন তারা। মিয়ানমার এই আদেশ বাস্তবায়ন করবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। তবে আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানালে গাম্বিয়া নেপিদোর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যেতে পারবে।

জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুল কাফি আহমেদ ইউসুফ দ্য হেগের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায়) আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্বর্তী আদেশ ঘোষণা শুরু করেন। তিনি গাম্বিয়ার অভিযোগকে আমলে নিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান। আইসিজে প্রেসিডেন্ট বলেন, গণহত্যা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গাম্বিয়ার আবেদনকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছে আইসিজে।

আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্লেষকরা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলছেন, আন্তর্জাতিক আদালতে করা গাম্বিয়ার মামলা একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত স্বীকার করেছে যে, রোহিঙ্গারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের সুরক্ষা দরকার।

নিউইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারের সভাপতি অখিলা রাধাকৃষ্ণান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন,  আইসিজে-র আদেশ মিয়ানমারকে সংকেত দিয়েছে যে তাদের তুচ্ছ অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাকি অংশকেও বার্তা দিয়েছে যে, এখনও রোহিঙ্গারা ভয়াবহ সব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর বিপরীতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস-এর কমিশনার রিড ব্রোডি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘বাস্তুচ্যুতি-হত্যা আর ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আজ তাদের ভোগান্তির স্বীকৃতি দিলো।’

আইসিজে-র বিচারক রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ঘোষণা করেন। এগুলো হলো—০১. রোহিঙ্গাদের হত্যা, মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন ও ইচ্ছাকৃত আঘাত করা যাবে না। ০২. গণহত্যার আলামত নষ্ট করা যাবে না। ০৩. গণহত্যা কিংবা গণহত্যার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র না করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ। ০৪. মিয়ানমারকে অবশ্যই চার মাসের মধ্যে লিখিত জমা দিতে হবে, যেন তারা সেখানে পরিস্থিতি উন্নয়নে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। এরপর প্রতি ৬ মাসের মধ্যে আবার প্রতিবেদন দিতে হবে। 

লিউভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক গ্লেইডার হার্নান্দেজের মতে, আইসিজে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা তাদের দেওয়া আদেশ বাস্তবায়নের তদারকি করতে চায়। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, "নজিরবিহীন না হলেও মিয়ানমারকে যে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে; সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।’ 

রিড ব্রোডি বলেন, 'আদালতের আদেশ বাস্তবতায় রূপ নেবে কিনা, রোহিঙ্গাদের জীবনমানের বাস্তবিক উন্নতি হবে কিনা, সেটা অনেক দূরের প্রশ্ন। তবে আজকে নিপীড়িত ওই জনগোষ্ঠী সত্যিকারের ন্যায়বিচারের স্বাদ পেলো।' সু চি সেনাবাহিনীর পক্ষে মামলা লড়তে নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার পর এমন আদেশ আসায় একে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার প্রতি তীব্র তিরস্কার হিসেবে দেখছেন তিনি।

প্রশ্ন উঠেছে, আইসিজে-র আদেশ মিয়ানমার বাস্তবায়ন করবে কিনা। রিড ব্রোডি বলেছেন, ‘সু চি-কে হেগে পাঠিয়ে মিয়ানমার আইসিজের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। আদালতের বৈধতা অস্বীকার করা এখন সরকারের পক্ষে সত্যিই কঠিন হয়ে উঠবে।’

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার যদি আদালতের অন্তবর্তীকালীন আদেশ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে গাম্বিয়া মামলাটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থানান্তর করতে পারবে। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে, তারা মিয়ানমারকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্য করবে কিনা। পরবর্তীতে যদি প্রমাণিত হয়, মিয়ানমার আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করেনি, তাহলে তাদের দায়ী করা যাবে।  

১৭ বিচারকের প্যানেল সর্বসম্মতভাবে এই রায় দিয়েছেন। রিড ব্রোডি বলছেন, এতে রায়টি স্বতন্ত্র মাত্রা পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা রাখাইনে হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করলে জীবন বাঁচাতে নতুন করে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া।

/এমপি/বিএ/

লাইভ

টপ