করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বাড়ছে চীনবিরোধী মনোভাব

করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বাড়ছে চীনবিরোধী মনোভাব

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:০০, জানুয়ারি ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৭, জানুয়ারি ৩১, ২০২০

নতুন করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীন সম্পর্কে বৈরি মনোভাব বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় তা বাস্তবিক উদ্বেগের মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাপানে টুইটার ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে ‘চীনারা জাপানে এসো না’ হ্যাশট্যাগ। সিঙ্গাপুরে কয়েক হাজার মানুষ দেশটিতে চীনা নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে একটি আবেদন করেছেন সরকারের কাছে। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের ব্যবসায়ীরা একটি প্রতীক তুলে ধরছেন যাতে বলা হচ্ছে, চীনা ক্রেতাদের স্বাগত জানানো হবে না। ফ্রান্সে একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় ‘হলুদ সংকেত’ প্রকাশ করে সতর্কতা জারি করেছে। কানাডার টরেন্টোর উপকূলে একটি জেলা স্কুলের অভিভাবকরা দাবি করেছেন, সম্প্রতি চীন থেকে ফেরা একটি পরিবারের শিশুদের ১৭ দিনের জন্য শ্রেণিকক্ষে আসতে না দেওয়ার জন্য।

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯ হাজার ৮০০ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শুক্রবার মৃতের সংখ্যা ২১৩ জন বলে ঘোষণা করেছে চীন, মৃতদের বেশিরভাগই চীনের নাগরিক। এই ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শহরে চীনাবিরোধী মনোভাবের ক্ষুব্ধ বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

চীনা কর্তৃপক্ষ ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। একই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীন সফর না করার ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। ফলে ভাইরাসটির বিপজ্জনক ছড়িয়ে পড়া চীনবিরোধী মনোভাবে জ্বালানি জুড়িয়েছে। এই ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক মাঝে মাঝে বাস্তবতার চেয়ে বেশি ঘটছে।

ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের এশিয়ান স্টাডিসের সহকারী অধ্যাপক ক্রিস্টি গোভেলা বলেন, এসব চীনাবিরোধী মনোভাবের নেপথ্যে চীন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা এবং আশঙ্কা রয়েছে। যেগুলো সাম্প্রতিক ভাইরাসের সংক্রমণে আরও বেশি সামনে আসছে।  

ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলো আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেমন- উহান ও কয়েকটি চীনা শহরে সবগুলো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল, বিভিন্ন সম্মেলনের আয়োজকরা চীনা প্রতিনিধি দলকে উপস্থিত না হওয়ার আহ্বান।

গত বৃহস্পতিবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে সবধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম সাময়িক সময়ের জন্য হুবেই প্রদেশসহ চীনের কিছু নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্টধরনের ভিসা প্রদান বন্ধ রেখেছে।

ফিলিপাইনের এক আইনপ্রণেতা রাল্প রেক্টো বলেন, আমি মনে করি চীনা ভ্রমণকারীদের আমাদের সাময়িক সময়ের জন্য ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’ নির্দেশিকা বসানোর সময়।

চীনা পর্যটকদের কাছে যেসব বিপনী বিতান জনপ্রিয় সেগুলো এড়িয়ে চলছেন ব্যাংককের বাসিন্দারা। সিউলের অভিজাত গ্যাংনাম এলাকার একটি প্লাস্টিক সার্জারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে, তারা চীনাদের সেবা দিতে পারবেন কেবল তখন যখন তারা প্রমাণ করতে পারবে গত ১৪ দিন বা এর বেশি দক্ষিণ কোরিয়ায় ছিলেন। ধারণা করা হয়, এই কয়দিনের ভেতরেই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে।

 

টোকিওর সুকিজি মাছের বাজারে একটি সুশি রেস্তোরাঁর ৯০ শতাংশ ক্রেতা ছিলেন চীনা নাগরিক। এখানকার ৭০ বছরের কর্মী ইয়ায়েকো সুয়েনাগা বলছিলেন, কেন চীনা ভ্রমণকারীদের স্বাগত জানাতে চাচ্ছে না তা তিনি বুঝতে পারছেন। বলেন, আমি মনে করি না এটি বৈষম্য থেকে আসছে। কিন্তু সত্যিকার আতঙ্ক থেকে মানুষ এমনটি করছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর আতঙ্ক।

তিনি জানান, তাদের রেস্তোরাঁয় সব ক্রেতাদের স্বাগত জানানো হবে। কিন্তু কর্মীরা সবাই মুখে মাস্ক পরবেন।

অনুধাবনযোগ্য আতঙ্ক ও ভুলবশত বৈষম্যের মধ্যে পার্থক্যের রেখা টানা সব সময় সহজ কাজ নয়। কিন্তু কয়েকটি সুরক্ষাজনিত পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বর্ণ বা জাতিগত বিভেদ সামনে নিয়ে এসেছে।

ভিয়েতনামের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা হোই অ্যান-এ ব্রেড বক্স নামের একটি রেস্তোরাঁর মালিক এই মাসের শুরুতে একটি সাইনবোর্ড টানিয়েছেন। তাতে লেখা রয়েছে, ‘আমরা চীনাদের সেবা দিতে পারছি না, দুঃখিত’। শনিবার ডানাং রিভারসাইট হোটেল ঘোষণা দিয়েছে, ভাইরাসের কারণে তারা কোনও চীনা অতিথিকে গ্রহণ করবে না।

বুধবার হংকংয়ের কং উইং ক্যাটারিং নামের রেস্তোরাঁ ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছে, তারা শুধু ইংরেজি বা ক্যান্টনিজ (স্থানীয় মাতৃভাষা) ভাষাভাষী লোকদের কাছে খাবার বিক্রি করবে। এই প্রতিষ্ঠানটি হংকংয়ের চীনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সরব সমর্থক।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতার কারণ কিছুটা তাদের কাছে বোধগম্য। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির শোরেনস্টেইন এশিয়া-প্যাসিফিক রিসার্চ সেন্টারের এশিয়া স্বাস্থ্যনীতি কর্মসূচির পরিচালক কারেন এগলেস্টন বলেন, এক হিসেবে এটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সম্ভাব্য রোগ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা। বিশেষ করে যখন জানামতে কোনও ওষুধ নেই।

তবে ঢালাও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট স্পষ্টভাবেই সীমা অতিক্রম করে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার দ্য হেরাল্ড সান একটি কালো মাস্কের ওপর লিখেছে, ‘চীনা ভাইরাস পান্ডা-মোনিয়াম’। দেশটিতে বসবাসরত ৪৬ হাজারের বেশি চীনা নাগরিক সংবাদমাধ্যমটির শিরোনাম ‘অগ্রহণযোগ্য বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক’ বলে একটি আবেদন করেছেন।

লা কুউরিয়ের পিকার্ড নামের উত্তর ফ্রান্সের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা ‘হলুদ সংকেত’ শিরোনাম প্রকাশ করেছে। যদিও পরে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।

জাপানে চীনা পর্যটকদের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের হতাশা রয়েছে। সম্প্রতি টুইটারে চীনা পর্যটকদের ‘নোংরা’, ‘সংবেদনশূন্য’ এবং ‘রাসায়নিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ভুল তথ্য প্রচারও হচ্ছে অনেক বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া অনেকবার দেখা একটি ইউটিউব ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, চীনের একটি রাসায়নিক অস্ত্র কেন্দ্র থেকে এই করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই তত্ত্ব বিশ্বের স্থানেও ছড়িয়ে পড়ছে। অস্ট্রেলিয়াতে ইনস্টাগ্রামে একটি ভুয়া পোস্টে গুজব ছড়ানো হয়েছে, সিডনির দোকানগুলো কুকিজ, চাল ও চীনা রেড বুল ভাইরাসে আক্রান্ত।

টোকিওর সোফিয়া ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোইচি নাকানো মনে করেন, ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ৫ কোটির বেশি মানুষকে লকডাউন করে রাখা হয়ত চীনা সরকারের মাত্রাতিরিক্ত পদক্ষেপ। তিনি বলেন, ঘটনা হলো চীনা সরকার নিজেদের মানুষদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যার ফলে অন্য মানুষ বা সরকার একইভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে উৎসাহী হচ্ছে। সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস।

/এএ/

লাইভ

টপ