করোনায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জীবন

Send
ব্রজেশ উপাধ্যায়, যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশিত : ০৫:০৬, মার্চ ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫২, মার্চ ২০, ২০২০

করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের অর্থনীতি অভাবনীয় স্থবিরতার মুখে পড়েছে। আর এ কারণে সেখানে বসবাসরত বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যা আগে কখনও হয়নি।

নিউ ইয়র্কে  বেশিরভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রেস্তোরাঁ, খুচরা দোকান, পাইজারিয়া (এক ধরনের রেস্তোরাঁ, যেখানে পিজ্জা জাতীয় খাবার পাওয়া), গিফট শপস ও এ জাতীয় দোকানগুলোতে প্রতি ঘণ্টা হারে কাজ করা লোকজনকে হয় ছাঁটাই করা হয়েছে অথবা সীমিত সংখ্যক ঘণ্টার জন্য কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বিশাল সংখ্যক লোকজন ট্যাক্সি ব্যবসায় জড়িত। করোনা মহামারির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের যানবাহনগুলো রাস্তায় নিতে পারছেন না।

গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাব চালান সজন মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘আমি সারাদিন কাজ করি। আর এতে মাত্র ৩৫ ডলার নিয়ে বাড়ি ফিরি, যা গ্যাস ও অন্যান্য ব্যয় বহনের জন্যও যথেষ্ট নয়। এখন  ২০০৮ সালের মন্দার থেকেও খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে। আমার জীবদ্দশায় এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখিনি।’

নিউ ইয়র্কে অনেক ক্যাব চালককে ট্যাক্সি চালানোর প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা মেডেলিনগুলোর জন্য মাসিক বন্ধক দিতে হয়। উবার বা লিফটের মতো অ্যাপ-ভিত্তিক পরিষেবার কারণে ইতোমধ্যে তাদের অনেকেই অর্থনৈতিক ভোগান্তিতে পড়েছেন।

অনেক বাংলাদেশির বাসা ভাড়া দেওয়ার জন্য কোনও সঞ্চয় থাকে না। যার ফলে এমন পরিস্থিতিতে তাদের ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছে অনেক বাংলাদেশি পরিবার।

বাংলাদেশি আমেরিকানদের আবাসন ও ভাড়াটিয়া বিষয়ক একজন অধিকারকর্মী হলেন রিমা খান। তিনি সম্প্রতি শ্রমিক শ্রেণির ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ বন্ধ করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আপাতত সরকারের থেকে উচ্ছেদের স্থগিতাদেশ পেয়েছি। তবে সব বাড়িওয়ালা সরকারি এই আদেশ মানছেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এমন এক বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলেছি, যার বাড়িতে তিন হাজার ভাড়াটিয়া থাকেন, যাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি। তিনি সরকারি এই আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এটা বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।’

নিউ ইয়র্কে সেসব বাংলাদেশি বসবাস করেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের বেতন দিয়ে বেশিরভাগেরই মাসিক প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা কষ্টসাধ্য হয়। এখন করোনা মহামারির এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকায় প্রতিদিনের ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান কমিউনিটির মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরিদ্র। সব দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বনিম্ন গৃহস্থালী আয় বাংলাদেশি ও নেপালি সম্প্রদায়ের। আর সেখানে বসবাসরত বৈধ নাগরিক নয়, বাংলাদেশি পরিবারের এমন সদস্যদের প্রায় ৬১ শতাংশ সম্পূর্ণরূপে সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল।

করোনা আতঙ্কের মধ্যে নিউ ইয়র্কের স্কুলগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ। একারণে বিনামূল্য মধ্যাহ্নভোজ পেতে বাংলাদেশি পরিবারের অনেকেই তাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। এখন স্থানীয় কিছু মসজিদও তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফেডারেল সরকার তাদের নাগরিকদের জন্য ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এতে অনেক বাংলাদেশি-আমেরিকান উপকৃত হতে পারেন। তবে এখানে আরও একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ রয়েছে, যারা নাগরিক নন এবং তাদের একমাত্র প্রত্যাশা- সবার আগে স্বাভাবিকতা ফিরে আসুক।

/এইচকে/বিএ/

লাইভ

টপ