করোনায় হুমকিতে ত্রাণ কার্যক্রম, ঝুঁকিতে লাখ লাখ মানুষের জীবন

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:৫৪, মার্চ ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৮, মার্চ ২৬, ২০২০

বিশ্বজুড়ে যে লাখ লাখ মানুষ কেবল মানবিক সহায়তার ওপর ভর করে টিকে আছে; করোনা মহামারি ঠেকাতে আরোপ করা বিধিনিষেধের কারণে ইতোমধ্যেই তাদের জীবন হুমকিতে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, ত্রাণ বিতরণকারী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলো এই বিধিনিষেধের কারণে ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে পড়বে।

কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরে বিশ্রামরত শিশু

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আরও দ্রুত গতিতে ছড়াতে শুরু করেছে করোনাভাইরাসের মহামারি। আর তা ঠেকাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত এবং বড় বড় বন্দর। ফলে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বন্ধ হয়ে গেছে নানা পণ্যের সরবরাহ।

করোনাভাইরাসের এই মহামারিতে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা দ্বিমুখী বিপদে পড়তে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারা যেসব দেশের সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকে তারাই এখন নিজ নিজ দেশে মহামারি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। আবার তাদের ওপর নির্ভরশীলদের ওপর সংক্রমণ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক লোলা ক্যাস্ট্রো জানিয়েছেন তারা ১২টি দেশে খাদ্য কর্মসূচি চালিয়ে থাকেন। গত তিন বছর ধরে খরার কারণে এসব দেশে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম হয়েছে। আর এই করোনা মহামারি ঠেকাতে আরোপিত বিধিনিষেধ পরিস্থিতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ বলে থাকে যে তারা এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন না তাহলে তারা ইস্যুটি বুঝতে পারছে না’।

করোনা মহামারি ঠেকাতে দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস দুইশো কোটি ডলার সংগ্রহের প্রচারণা করেছেন। আর এরই মধ্যে করোনার মহামারিতে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে নতুন করে মানবিক পরিস্থিতির বিষয়ে হুঁশিয়ারির কথা জানা গেলো।   

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি) জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চলাফেরার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এরমধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তিন লাখ মানুষ। এনআরসি’র মহাসচিব জ্যান এগেল্যান্ড বলেন, ‘সরকারগুলো যখন করোনাভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে কঠোর এবং অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে তখনও লাখ লাখ শরণার্থী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসাকর্মী, খাদ্য বিক্রেতা বা ফার্মেসির মতো ত্রাণ কর্মীদেরও একই শ্রেণীতে ফেলা দরকার। এই সংকটের সময়ে যদি সুপারমার্কেট এবং ফার্মেসি সচল থাকতে পারে তাহলে মানবিক ত্রাণ সহায়তাও সরবরাহ করতে পারা উচিত’।

সরকারি বিধিনিষেধের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে ত্রাণ কার্যক্রম বাতিলে বাধ্য হয়েছে মানবিক সংস্থাগুলো। ফলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্য মধ্যে পড়েছে। এনআরসি মহাসচিব জ্যান এগেল্যান্ড বলেন, ‘এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কোনও কোনও অংশে বাস্তুচ্যুত মানুষের জনাকীর্ণ আশ্রয়গুলোতে কোভিড-১৯ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি খুবই বেশি। তাদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা না পারলে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে’।

লন্ডনের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (ওডিআই)গবেষক বিদ্যা দিবাকর বলেন, ‘এটা সত্যিকার ইস্যু’। তিনি বলেন, ‘রোগের সরাসরি প্রভাব রয়েছে কিন্তু সীমান্ত এবং পণ্য সরবরাহ বন্ধের পরোক্ষ প্রভাবও রয়েছে। সরবরাহের ভিন্ন উপায় নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন আছে, যেমন মোবাইল পেমেন্ট। কিন্তু সমস্যা হলো চরম দারিদ্রে নিমজ্জিত মানুষের কাছে মোবাইল নেই’।

ওডিআই’র আরেক গবেষক অ্যান্ড্র শেপার্ড বলেন, ‘আরেকটি বড় বিষয় হলো এটা দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকা মহামারি। এসব দেশের অনেকগুলোর দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং খাবারের ইস্যুতে আমরা আসলেই খুব কম সময় পাবো’। তিনি বলেন, ‘দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ব্যাপক পরিমাণ প্রয়োজন থেকে আমরা কোন বিষয়গুলোতে আগে গুরুত্ব দেবো’। তিনি বলেন, ‘আমরা সেই দেশগুলোকে নিয়ে কথা বলছি যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা সংঘাতের মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। সেই কারণে এই সপ্তাহে বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব’।

আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই দেশটি থেকে। দেশটির ৫৩টি সীমান্ত চৌকির মধ্যে ৩৫টি হয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে না হয় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো ছাড় চাইলেও এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত পায়নি।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগে থেকে ওই অঞ্চলের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলো। এর মধ্যে প্রায় ৮১ লাখ মানুষ ডব্লিউএফপি’র সহায়তার ওপর নির্ভর করে বলে জানান আঞ্চলিক পরিচালক লোলা ক্যাস্ট্রো। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরের নিস্ফলা মওসুম খুবই কঠিন ছিলো, প্রায় কোনও বৃষ্টি হয়নি, কোনও ফসল হয়নি। জিম্বাবুয়েতেও প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে আমরা সহায়তা দিচ্ছি। আমরা বলছি আরও লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হতে পারে’।

দক্ষিণ সুদান থেকে শুরু করে ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর মতো কয়েকটি দেশে বিদেশি কর্মীদের প্রবেশের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় আফ্রিকায় প্রাত্যহিক ত্রাণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

কেবল আফ্রিকাতে নয়। আফগানিস্তানেও বিপুল সংখ্যক মানুষ ইরান থেকে ফিরে এসেছে। দেশটিতে ত্রাণ সরবরাহের প্রধান রুট পাকিস্তান তাদের যৌথ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও দেশটি এখন পর্যন্ত পণ্যবাহী যানগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে তারপরও পরিস্থিতির ওপর উদ্বেগসহকারে নজর রাখা হচ্ছে।

প্রতিবেশি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় নয় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। দেশটি দাতা সংস্থাগুলোকে নতুন কর্মী না পাঠানোর কথা বলে দিয়েছে। এছাড়া শরণার্থী শিবির এবং পাশ্বর্বর্তী কক্স বাজার শহরে চলাচল সীমিত রাখতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার ত্রাণ কর্মীরা।

এনআরসি মহাসচিব জ্যান এগেল্যান্ড বলেন, ‘ত্রাণ কর্মীরা যদি লকডাউন বা বাড়ি থাকার নির্দেশের কারণে জরুরি সেবার পরিসর বাড়াতে না পারে তাহলে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সরবরাহ শেষ হয়ে যাবে আর বাস্তুচ্যুত মানুষদের লাইফলাইন কাটা পড়বে’। তিনি বলেন, ‘সরকারগুলোকে অনুরোধ করছি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে আমাদের অবস্থান এবং সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক যাতে আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের রক্ষা এবং সহায়তা করতে পারি’।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক লোলা ক্যাস্ট্রো বলেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও তাদের সংস্থা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আমাদের দল এবং আমাদের সুবিধাভোগীরা সবাই মিলে আমরা সরবরাহ মডেল সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছি। বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে আমরা ভিড় কমিয়েছি আর হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিতের প্রচলন করেছি’। ‘এখন আমাদের সীমান্ত, বিমান এবং বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকেও উত্তরণ করতে হবে। আমরা বহু সংখ্যক ফ্যাক্টরের বিরুদ্ধে লড়াই করছি’, বলেন তিনি।

/জেজে/বিএ/

লাইভ

টপ